নীড়পাতা শিল্প সাহিত্য গল্প আব্দুল্লাহ আল নোমান এর গল্প “মাহিনের ঘর”

আব্দুল্লাহ আল নোমান এর গল্প “মাহিনের ঘর”

397
0

আব্দুল্লাহ আল নোমান:

শেফালি এবং আসিফ সাহেবের প্রথম সন্তান মাহিন। ছোট বেলা থেকেই মাহিন খুবই গম্ভীর প্রকৃতির। সারা দিন কি যেন এক ভাবনায় ডুবে থাকে। ভাবনা টা অবশ্য একটা ঘরের মধ্যে। মাহিন খুব যত্ন করে বাঁশ,বেত আর কলা পাতা দিয়ে একটি ঘর তৈরি করে। এই ঘরে বসেই মাহিন জোছনা দেখে, পূর্নিমা রাতে সরল অংক খসে। মাহিনের প্রিয় জিনিস গুলো সেই ঘরে রাখত। প্রিয়ন্তির দেয়া ছোট্ট ছোট্ট উপহার গুলোও মাহিন এই ঘরে সাজাতো । প্রিয়ন্তি ছিলো মাহিনের বাবার বাল্য বন্ধু আজগর আলীর মেয়ে। ওদের পাশের বাড়িই প্রিয়ন্তির বাড়ি। প্রিয়ন্তি মাহিনের দু বছর তিন মাসের ছোট। প্রিয়ন্তি সব সময়ই কথা বলে, কথা না বলে প্রিয়ন্তি থাকতে পারে না। রহিম চাচার মেয়েকে কে কে বিয়ের প্রস্তাব দিলো, ও পাড়ায় কয়টা নতুন ঘর উঠলো, কাশেম চাচার কয়টা বাছুর হলো পাড়ার সব কিছুই মাহিন প্রিয়ন্তির কাছ থেকে জানে। মাহিনের ইচ্ছা না থাকলেও সব কিছুই শুনতে হবে, না হলে যে প্রিয়ন্তির কথা দিয়ে পেট ভরতি থাকবে।।

মাহিনের সব কিছুতেই প্রিয়ন্তির হাত, শুধু ঐ একটি ঘর ব্যতীত। মাহিনের ঘরে মাহিনকেই এতবার ডাকা হয় না যতবার প্রিয়ন্তিকে ডাকা হয়। মেয়টি যেন এই ঘরেরই একজন। মাহিনের বাবাও প্রিয়ন্তির জন্মের পর থেকে বন্ধুকে বেয়াই বলে ডাকছেন।

মাহিন ভালো পড়াশোনার জন্য ঢাকার একটি বডিং কলেজে চলে আসে। প্রিয়ন্তির বাবাও প্রিয়ন্তিকে মামাদের কাছে পাঠিয়ে দেন।
প্রিয়ন্তির মেঝো মামা এসিস্টেন মাষ্টার, উনি আবার কঠিন মানুষ। প্রিয়ন্তি প্রথমে মামা বাড়ি আসতে রাজি হয় নি। ও জানে এখানে আসলে তাকে কঠিন নিয়মের মধ্যে পড়তে হবে। মাহিন বাড়িতে নেই, প্রিয়ন্তির কথা বলার মানুষও নেই। তাই প্রিয়ন্তিও রাজি হয়ে যায়। মাহিন পড়াশুনা নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। শহরের যান্ত্রিক জীবনে মাহিন তার কলাপাতার ঘর খুঁজতে থাকে। চঞ্চলা প্রিয়ন্তি কথা বলা একেবারে কমিয়ে দেয়।সে এখন আর প্রয়োজন ছাড়া কথা বলে না। মামা বাড়ির নিয়ম শৃঙ্খলায় প্রিয়ন্তিও পড়াশুনায় খুব নিয়মিত হয়ে যায়।

মাহিন বাড়ি আসার আগেই আসিফ সাহেব মাহিনের কলাপাতার ঘরটি ঠিক করে রাখেন। বাড়িতে এখন অনেক কলা গাছ লাগানো। আসিফ সাহেব খুব আনন্দ নিয়ে ঘরের কলাপাতা পরিবর্তন করেন। কারন তার ছেলে বাড়িতে এসে প্রথমেই এই ঘরটিতে ঢুকবে।
মাহিন আর প্রিয়ন্তির এখন বছরে মাত্র দুবার দেখা হয়। তাও দুই ঈদে। অনেক দিন পরে দেখা হয় বলে প্রিয়ন্তি আগের মতো কথা শুরু করতে পারে না।সে অবাক চোখে মাহিনের দিকে তাকিয়ে থাকে।মাহিন ও অপেক্ষায় থাকে কখন প্রিয়ন্তির সেই দুষ্টু মিষ্টি কথাগুলো শুনবে।এক সময় প্রিয়ন্তি তার জমিয়ে রাখা কথামালা বলতে শুরু করে,যা অবিরাম চলতে থাকে ঘন্টার পর ঘন্টা। মাহিনের ও কথা বলার ইচ্ছা হয়। কিন্তু কেন যেন বলা হয় না। সে শুধু শুনেই যায়। পুরোটা রাত দুজনে গল্প করে কাটিয়ে দেয়। মাহিনের গল্পগুলো থাকে ফিজিক্স আর কেমেষ্টি বইয়ের পাতা থেকে।ওর কথাগুলো প্রিয়ন্তির কাছে পান্তাভাতের মতো মনে হতো।

মাহিন আর প্রিয়ন্তি বাড়িতে আসলেই দুবাড়িতে উৎসব শুরু হয়ে যেতো। রান্নাঘর তখন পাহারা দেন আসিফ সাহেব।তিনি নিজ হাতে গিয়ে বাজার করেন। আজ বাজার থেকে দুইটা বড় দেখে রাজ হাঁস কিনেছেন। প্রিয়ন্তি মেয়েটার রাজ হাঁসের মাংশ খুবই পছন্দের। আসিফ সাহেব প্রথমে প্রিয়ন্তিকে মামা বাড়ি পাঠানোর জন্য রাজি ছিলেন না, উনার কথা হলো, প্রিয়ন্তির মামাদের নাকি ঘড়ির কাঁটা চালায়, ঘড়ি ঠিক করে দেয় ওরা কখন কি কাজ করবে।তাই আসিফ সাহেব প্রিয়ন্তির মামাদের নাম দিয়েছেন মিশিন মানব। কিন্তু প্রিয়ন্তির এমন রিজাল্ট দেখে উনি এখন আর কিছুই বলেন না। তবে প্রতি মাসেই একবার উনি চিঠি দিয়ে প্রিয়ন্তির খবর নেন। চিঠির ভেতর প্রিয়ন্তির জন্য কিছু হাত খরচের টাকা থাকত।এতে প্রিয়ন্তির মামারা খুব রাগ করতেন।মাষ্টার সাহেব গলার স্বর উচু করে বলতেন এ বাড়িতে কি মেয়ের কোন কিছুর অভাব হয়?কিন্তু আসিফ সাহেব কি আর এত সব শুনেন। মাষ্টার সাহেবের আসিফ সাহেবকে একটু অপছন্দ।কারন উনি সব সময়ই মাষ্টার সাহেবদের নিয়ে রসিকতা করেন।

মাহিন এবার ঢাকা থেকে আসার সময় প্রিয়ন্তির জন্য বড় একটা ডায়রী কিনে আনে। প্রিয়ন্তি কথা বলে বেশি, তাই লিখবে ও বেশি। এই ধারনা থেকে মাহিনের বড় ডায়রী কেনা।
ডাইরির প্রথম পাতায় মাহিন লিখেছে,
“লিখে রাখিস আমাকে না বলা কথাগুলো”
২২.৪.১৯৯০
প্রিয়ন্তি এই লিখাটাই হাজার বার পড়েছে। কেমেষ্টি মাষ্টার যে এসবও লিখতে পারে তা প্রিয়ন্তি কল্পনাও করতে পারেনি। প্রিয়ন্তির ধারনা মাহিন শুধু জ্ঞান আর উপদেশ দিতে পারে। প্রেম ভালোবাসা এসব কিছু মাহিনকে স্পর্শ করতে পারে না। প্রিয়ন্তি মাহিনকে অনেক লম্বা লম্বা চিঠি লিখে। প্রিয়ন্তির সব ভালোবাসার অনুভতি গুলো চিঠিতে থাকে।
কিন্তু মাহিনের উত্তর গুলো থাকে এ রকম

প্রিয় প্রিয়ন্তি,
পড়ালেখার কি অবস্থা। নিয়মিত কলেজে ক্লাস করা হয়? হাতের লিখা আরো ভালো করতে হবে।

ইতি
মাহিন।

ডায়রী হাতে নিয়ে সব লেখা একবারেই লেখার ইচ্ছা হয় প্রিয়ন্তির।সে এই ডায়রীতে লিখবে, তার ভালোবাসার কথা,রাগ,অভিমান,কান্না সবকিছু। প্রিয়ন্তি প্রথম পাতাতেই লিখলো,

“ভাসিয়ে দেবার প্রবণতা প্রকৃতির ভেতর আছে। সে জোছনা দিয়ে ভাসিয়ে দেয়, বৃষ্টি দিয়ে ভাসিয়ে দেয়, তুষারপাত দিয়ে ভাসিয়ে দেয়। আবার প্রবল প্রেম, প্রবল বেদনা দিয়েও তার সৃষ্টজগৎকে ভাসিয়ে দেয়।”

মাহিন জাহাঙ্গির নগর বিশ্ববিদ্যালয়ে কেমেষ্টি নিয়ে পড়াশুনা শুরু করে। তিনদিনের মাথায় নিলা নামের একটি মেয়ের সাথে মাহিনের পরিচয় হয়। মাহিনের পরিচয় হয় বললে ভুল হবে কারন মেয়েটি নিজ থেকে এসে মাহিনের সাথে পরিচিত হয়। আপনার নাম মাহিন না? জ্বি, আমি মাহিন।
শুনেছি তুমি নাকি পড়াশুনায় খুবই ভালো। প্রথম দিনই মেয়ে টা আপনি থেকে তুমিতে চলে আসে। মাহিন নিচের দিকে তাকিয়ে হলের দিকে চলে গেলো। সে এখন নিলাকে দেখলেই এদিক ওদিক চলে যায়।একদিন হঠাৎ করে মাহিনের রিক্সা থামিয়ে নিলা রিক্সায় উঠে গেলো।
মাহিন বলে উঠলো,আরে আপনি কি করেন?
নিলা :আপনি এত আপনি আপনি করবেন না। আজ সারা দিন আপনাকে নিয়ে ঘুরবো।
ঘুরবো মানে, আমি অপরিচিত কারো সাথে কথাই বলি না আর ঘুরা। শুনেন, আমার অনেক কাজ আছে। আপনি নামেন রিক্সা থেকে। নিলা কি আর এসব শুনে। রিক্সাওয়ালা মামাকে বলে এখন থেকে আমি যে দিকে বলবো সে দিকে যাবে, বুঝলা মামা। মাহিন নিলার কাছ থেকে সরে বসলো। নিলা বলল, জানো মাহিন, এ জন্যই তোমাকে আমার এতো ভালো লাগে। তোমাকে দেখলেই মনে হয় অনেক দিন থেকে আমি তোমাকে চিনি এবং তোমাকেই বিশ্বাস করা যায়।
মাহিনের চোখে হঠাৎ করেই প্রিয়ন্তির মুখ ভেসে উঠল । সে কানের কাছে শুনতে পেলো, প্রিয়ন্তি তাকে ডাকছে, মাহিন এই মাহিন।।
মাহিনের সমস্ত শরীর ঘেমে গেল। সাথে সাথে মাহিন রিক্সা থেকে নেমে দ্রুত চলে গেল।।
নিলা সেদিন রাতে বৃষ্টিতে প্রচুর ভিজলো, বৃষ্টির জল আর চোখের জল এক হয়ে গেলো তার।

প্রিয়ন্তি আজ ডায়রীটা হাতে নিয়ে লিখতে বসেছে,
প্রিয় মাহিন,
খুব জানতে ইচ্ছে করে, তর ঐ কলাপাতার ঘরে কি আমি আছি? কলাপাতার ঘরটা কি আমার হবে, সেখানে কি বসে দুজনে রাতের জোছনা, ঝিঝি পোকার শব্দ, চাদের আলো এক সাথে দেখবো?

এক রাতে আসিফ সাহেবের হার্ট ষ্ট্রোক হলো।
জেলা শহরের হাসপাতালে আসিফ সাহেবকে নিয়ে যাওয়া হলো। উনি হাসপাতালে যেতে যেতে বলেলেন মাহিন আর প্রিয়ন্তিকে যেন এখন এসব কিছু জানানো না হয়। উনিচোখ বন্ধ করে হাসপাতালের বেডে শুয়ে আছেন। হঠাৎ দেখলেন দূর থেকে একটি সাদা ঘোড়া তার দিকে এগিয়ে আসছে, সেই ঘোড়ায় মাহিন এবং প্রিয়ন্তি বিয়ের সাজে বসা। খুশিতে আসিফ সাহেবের মন ভরে গেলো।তিনি আবেগাপ্লুত হয়ে গেলেন।জীবনে এর থেকে ভালো দৃশ্য উনি আর কখনো দেখেন নি।
আসিফ সাহেব চোখ খুলে দীর্ঘ নিশ্বাস নিলেন
আর মনে মনে বললেন, হয়ত আমার দিন ফুরিয়ে আসছে, এর জন্য আল্লাহপাক আমাকে এমন ভালো দৃশ্য দেখাচ্ছেন।
হাসপাতালে বেশিদিন থাকা হলো না আসিফ সাহেবের। বাড়ি ফিরেই মাহিনের মায়ের সাথে কথা বললেন। আর দেরী করা ঠিক হবে না। আজগর আলীর সাথে কথা বলতে হবে। মাহিন আর প্রিয়ন্তির বিয়ের জন্য।।

আসিফ সাহেব খুব সকালে ঘুম থেকে উঠলেন। সকাল সকাল গোসলটা সেরে নিয়ে একটা সাদা পাঞ্জাবি পড়ে বাজারের দিকে রওয়ানা হলেন।পাপ্পু মিষ্টিভান্ডার থেকে মিষ্টি কিনলেন। প্রিয়ন্তির বাড়িতে গিয়ে আজগর আলীকে জোরে জোরে ডাকলেন, আজগর আলী ঘর থেকে বেরিয়ে আসতেই আসিফ সাহেব বললেন, আজ আমাকে একটু বেশি খাতির যত্ন করতে হবে।
আজ প্রিয়ন্তিকে ঘরে নেবার সব কথাই পাকা করব। আজগর আলী বললেন, এ মেয় কি আর আমার? প্রিয়ন্তিকে কবে থেকেই নিয়ে নিয়েছিস।
আসিফ সাহেব বললেন আচ্ছা একটা কাজ করলে কি হয়, মাহিন আর প্রিয়ন্তিকে চমকে দিলে কেমন হয়। দুই বন্ধু মিলে বিয়ের বাজার সদাই সব করলাম,আত্নীয় স্বজন সবাই কে দাওয়াত করলাম, বাড়িঘর সব আলো দিয়ে সাজিয়ে রাখলাম,মাহিন আর প্রিয়ন্তিকে চিঠি দিয়ে বলবো আগের দিন চলে আসতে।
প্রিয়ন্তির মামাদের কে বলবে আসতে, বিশেষ করে এসিস্টেন মাষ্টার সাহেবকে।
আজগর আলী বললেন, বন্ধু বয়স বাড়ার সাথে সাথে তর রসিকতা বেড়েই যাচ্ছে।।

আসিফ সাহেব নিজে দাঁড়িয়ে থেকে বাড়িঘর সাজাতে লাগলেন, বাড়ির সামনে কলাপাতা দিয়ে একটি গেইট সাজালেন। হেজাক বাতি দিয়ে সমস্ত বাড়ি আলো করে নিলেন।বাড়ির পাশেই অথিতিদের জন্য পেন্ডেল বানালেন। শেফালি বেগমকে সাথে নিয়ে শহরের বড় বড় দোকান থেকে প্রিয়ন্তির জন্য শাড়ি, গহনা কিনলেন।

মাহিন পারাবত ট্রেনের টিকেট কাটলো আর এ দিকে প্রিয়ন্তি, এসিস্টেন মাষ্টার, বড় মামি, আর প্রিয়ন্তির ছোট মামা মাইক্রোবাস নিয়ে রওয়ানা হলেন।
প্রিয়ন্তি মাহিনের দেওয়া ডায়রী জড়িয়ে ধরে বসে আছে আর ভাবছে,কোনো কারণ ছাড়া তাকে এভাবে হঠাৎ করে কেনো বাড়িতে আসতে হচ্ছে। মনে মনে কতো কিছুই না সে মাহিনকে নিয়ে কল্পনা করছে।মাহিনও কি বাড়িতে আসবে,তার সাথে ও কি দেখা হবে।। কিন্তু সব কল্পনার অবসান ঘটলো
মাঝ রাস্তায় এসেই।বড় একটা বাসের সাথে প্রিয়ন্তিদের গাড়ি ধাক্কা খেলো।
নিমিষেই সব কিছু পাল্টে গেলো। ডায়রীটা তখন ও বুকে জড়ানো মেয়েটার।আর তার নিতর দেহ পড়ে রইলো রাস্তার পাশে।এসিস্টেন মাষ্টারও আর নিশ্বাস নিচ্ছেন না।প্রিয়ন্তির ছোট মামা কিছুই বিশ্বাস করতে পারছেন না,শুধু চিৎকার করছেন।।

প্রিয়ন্তির দেহ বাড়িতে আনা হচ্ছে। আসিফ সাহেব চিৎকার দিয়ে বললেন, বাড়ির সব লাইট ঝালিয়ে দেবার জন্য। লাল,নীল,হলুদ আলোর মধ্য দিয়ে আমার প্রিয়ন্তি বাড়িতে আসবে।জোর গলায় বললেন, কেউ যেন চোখের জ্বল না ফেলে। অথচ নিজেই চোখের জল ধরে রাখতে পারলেন না। কষ্টগুলো গাল দিয়ে গড়াতে লাগলো।
এদিকে মাহিন রক্তাত্ব ডায়রীটা নিয়ে প্রিয়ন্তির পাশে বসে আছে।।

লেখক
নাম : আব্দুল্লাহ আল নোমান। 

রিপ্লাই করুন

অনুগ্রহ করে আপনার মন্তব্য লিখুন
অনুগ্রহ করে আপনার নাম লিখুন