নীড়পাতা ফিচারড করোনার আঘাতে বিয়ানীবাজারে বেসরকারি সেবা – আতাউর রহমান

করোনার আঘাতে বিয়ানীবাজারে বেসরকারি সেবা – আতাউর রহমান

করোনারআঘাতেবিয়ানীবাজারেবেসরকারিসেবা

করোনায় বিয়ানীবাজার ওয়েল ফেয়ার ট্রাস্ট’র মতো দেশি-বিদেশী সংগঠন ও ব্যক্তি উদ্যোগের জয়গান-
।। আতাউর রহমান।।

করোনার বিধ্বংসী আঘাতে বিশ্বব্যাপী কান্নার রোল। কেউ স্বামী হারা, কেউ প্রিয়তমা হারা, কেউ সন্তান হারা, কেউ বাবা-মা হারা। স্বজন হারাদের শোকের মাতম আজ সারা দুনিয়াজুড়ে। বিশ্বের দু’দুটো বিশ্বযুদ্ধ এমন মাতম তুলেনি। যেসব শক্তিধর দেশগুলো বারবার মানবতা লুন্টন করতো, তারাও আজ দিশেহারা। এখন বিশ্বের দেশে দেশে বিরোধ নেই। কেউ কাউকে ঘায়েলও করছে না। অথচ মানবতার আর্তনাদ বেসামাল হয়ে দেখা দিয়েছে। কোভিড-১৯ মোকাবিলায় সমগ্র বিশ্ব একদিকে থেকেও আজ টালমাটাল পৃথিবী। করোনার হিংস্র থাবা সবকিছুকে যেন ম্লান করে দিয়েছে।

আমরা দেখলাম, করোনায় যত বিস্তার ঘটাল, তাতে দেখালো তাঁর নতুন নতুন রূপ। কখনো চাল, ডাল, তেল, মসলা নিয়ে ছুটে যাচ্ছেন লকডাউনের মধ্যে অসহায় মানুষের ঘরে ঘরে। যখন বাংলাদেশে করোনা আতঙ্কে সন্তান তাঁর জন্মদাত্রী মাকে রাস্তায় ফেলে পালিয়ে যাচ্ছে, আক্রান্ত হওয়ার ভয়ে কোনো আলেম জানাজা পড়াচ্ছেন না করোনায় মৃতকে, পুলিশ কর্মকর্তাকে পালন করতে হচ্ছে ইমামের ভূমিকা, সেখানে আমাদের পঞ্চখণ্ড মাটির তরুণ প্রজন্মের ডাক্তার ডাঃ মাছুম আহমদ, ডাঃ আবু ইসহাক, ডাঃ শিব্বির আহমদ সুহেল, ডাঃ আব্দুস সালাম মুক্তা’রা জীবন বাজি রেখে চেম্বার খুলে রোগীদের অভয় দিচ্ছেন, সেবা দিচ্ছেন। আর যাদেরকে আক্রান্ত মনে করছেন তাদেরককে টেলিমেডিসিন দিয়ে নতুন জীবনে ফিরে আসার সাহস যোগাচ্ছেন। আর লুটেরা এক শ্রেণীর বাণিজ্যিক ডাক্তারা কথিত চেম্বার বন্ধ করে নিমেষেই উধা হতেও দেখলাম। এ দৃশ্যপট মনে থাকবে অনেকদিন।
গত ২১মে করোনায় মৃত বিয়ানীবাজারের পল্লী চিকিৎসক আবুল কাশেমের মরদেহ গোসল করানো হয় ইসলামিক ফাউন্ডেশনের তত্বাবধানে। বিশেষ ব্যবস্থায় প্যাকেট ভর্তি করে তার মরদেহ নিয়ে আসা হয় মাটিজুড়া মালোপাড়া গ্রামের কবরস্থানে। শেষবারের মত তার মুখ দেখতে কেউ আসেনি। আসেনি নিজ পরিবারের সদস্যরাও। প্রশাসনের কর্মকর্তারা মরদেহ দাফনের প্রস্তুতিকালে স্বেচ্ছায় উপস্থিত হন কওমী মাদ্রাসার শিক্ষক ও শিক্ষার্থী। তাঁরা স্বাস্থ্য সুরক্ষা সামগ্রী পরে দাফন কাজ সম্পন্ন করেন। তারা হলেন- খাসার হাফিজ মাওলানা আবু সাইদ, নয়াগ্রামের হাফিজ মাওলানা ফয়সল আহমদ, হাফিজ মাওলানা নজরুল ইসলাম, আকাখাজনার মাওলানা জামিল আহমদ, সুপাতলার রেদওয়ান আহমদ, খাসাড়িপাড়ার হাফিজ জাহেদ আহমদ, লাউতার মাওলানা গোলাম রাব্বানী মাসুম, খাসার হাফিজ মাওলানা আব্দুল্লাহ প্রমুখ। তাদের ভাষ্য, কওমীর শিক্ষার্থীরা একমাত্র আল্লাহকে ভয় পায়।
এমম ধ্বংসরূপ ইতিপূর্বে কেউ কখনো দেখেনি। এরপরও হিংস্র আর্তনাদ ছাপিয়ে সারা বিশ্বে জেগে উঠেছে মানবতার জয়গান। যার ঢেউ এসে লেগেছে সিলেটের নবদ্বীপ খ্যাত বিয়ানীবাজারে। জাতি-ধর্মের ঊর্ধ্বে উঠে মানবসেবায় এগিয়ে এসেছে মানুষ; শুধুই মানুষের জন্য।

এ COVID-19 করোনা তাণ্ডবকালে আব্দুল করিম নাজিম -ফরহাদ হোসেন টিপু এবং ইফতেখার আহমদ শিপন’র নেতৃত্বাধীন ‘বিয়ানীবাজার ওয়েল ফেয়ার ট্রাস্ট’ বিয়ানীবাজার সরকারী হাসপাতাল, বিয়ানীবাজার থানা পুলিশ, উপজেলা প্রশাসনে বিলি করতে লাগলেন নিরাপত্তা সামগ্রী ফেইস মাস্ক, গ্লাভস, পিপি ইত্যাদি। এখানেই শেষ নয় তাঁদের সেবার হাত পৌঁছে গেল ঢাকার উত্তরা উইমেন্স মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, সিলেট ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, সিলেট জেলা পুলিশ ও মেট্রোপলিটন পুলিশ, বডলেখা উপজেলা স্বাস্হ্য কমপ্লেক্স, পুলিশ স্টেশন পর্যন্ত। পাশাপাশি চলমান আপদকালীন সময়ে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের মাধ্যমে তালিকা করে ইউনিয়ন প্রতি ৪০জন আলেমকে ২৫কেজি করে বিয়ানীবাজার পৌরসভা ও উপজেলার ১০টি ইউনিয়নে চাল উপহার দেয়া হয়। এছাড়া বিয়ানীবাজার শহরে ভাসমান ১০জন দু:খী মানুষকে ১৭আইটেমের এক মাসের খাবার সরবরাহ করা হয়। ট্রাস্টের পক্ষে আলীনগর ও দুবাগ এলাকায় ১০ জনের হাতে খাদ্য সামগ্রী তুলে দেন আলীনগর ইউপি চেয়ারম্যান মামুনুর রশীদ মামুন। একই দিনে চারখাই ইউনিয়নের ৩জন কোরআনে হাফেজকে চেয়ারম্যান মামুন-র মাধ্যমে ২৫ কেজি করে চাল উপহার দেয়া হয়। ১৮মে সোমবার বিয়ানীবাজার উপজেলা পরিষদ হলরুমে কোরআনে হাফেজসহ মধ্যবিত্ত আরো ৯০জনকে ২৫ কেজি করে চাল উপহার দেয়া হয়। একই দিনে মাথিউরা ইউনিয়নের শিক্ষক ইমাম পেশাজীবী ৫জনকে ৫০কেজি চাল উপহার দেয়া হয়। যুক্তরাজ্যস্থ চ্যানেল এস টিভি’র স্থানীয় রিপোর্টার এম.হাসানুল হক উজ্জ্বল এই সংস্থার মানবতাবাদী বন্টন কাজে তাদের হয়ে কো-অর্ডিনেটরের ভূমিকা পালন করলেন। তার শ্রম ও মেধা প্রতিদানযোগ্য। উক্ত কর্মসুচির আওতায় আজ(২৩মে) ১০০টি পরিবারের মাঝে ঈদ উপহার বিতরণ করা হবে। ফরহাদ হোসেন টিপু জানান, মানুষের কষ্টে মন কাঁদে। আমরা মানুষের সাহায্যার্থে আরো নতুন নতুন কর্মসুচির পরিকল্পনা গ্রহণ করছি।

বিয়ানীবাজার ওয়েল ফেয়ার ট্রাস্ট’র মতো আরো অনেক কমিউনিটি সংগঠন ও ব্যক্তি উদ্যোগে বিপদগ্রস্ত মানুষের সহায়তা চালিয়ে যাচ্ছেন। তন্মধ্যে যুক্তরাজ্যস্থ বিয়ানীবাজার জনকল্যাণ সমিতি, ‘নিদনপুর-সুপাতলা ওয়েলফেয়ার ট্রাস্ট’, বিয়ানীবাজার থানা জনকল্যাণ সমিতি, শ্রীধরা ওয়েলফেয়ার ট্রাস্ট, কসবা-খাসা ওয়েলফেয়ার ট্রাস্ট, দাসউরা জনকল্যাণ সমিতি, যুক্তরাষ্ট্রস্থ মাথিউরা সমিতি, কামারকান্দি প্রবাসী উন্নয়ন ট্রাস্ট, মানবকল্যাণ সংগঠন ‘শিশুদের জন্য আমরা-বিয়ানীবাজার’, স্পন্দন-তিলপাড়া, ‘বাংলাদেশ যুবলীগ’ ও ‘বাংলাদেশ ছাত্রলীগ’ প্রমুখ সংস্থার নাম উল্লেখযোগ্য।

এছাড়াও বিয়ানীবাজারের প্রতিটি গ্রামের প্রবাসী ও বিত্তশালীদের আর্থিক অনুদানে ভুক্তভোগীদের হাতে নগদ অর্থ ও খাবার বিলিয়ে দেয়া হচ্ছে। একই ধারাবাহিকতায় পারিবারিক ও ব্যক্তি উদ্যোগে মানবসেবায় নাম লিখিয়েছেন অনেকেই।

প্রিয় দুই শিক্ষার্থী খ্যাতনামা ব্যারিস্টার আবুল কালাম চৌধুরী ও যুক্তরাজ্য কমিউনিটি ব্যক্তি ফখরুল ইসলামকে নিয়ে আমার খুব গর্ব হয়। ব্যারিস্টার আবুল কালাম চৌধুরী “আইয়ুব-সুফিয়া ফাউণ্ডেশন” ব্যানারে চারখাই এলাকায় ও ফখরুল ইসলাম ‘প্রেরণা যুবচক্রে’র সৌজন্যে ও ‘এম.এ.সালাম গ্রুপ এণ্ড ট্রাস্ট’-এর ব্যানারে সমগ্র উপজেলা ব্যাপী মানবতার কাজ চালিয়েছে। আল্লাহ তাদের এই দান যেন কবুল করে নেন। তাদের ন্যায় বিবেকের দায় থেকে মুল্লাপুর গ্রামের ভিপি সরোয়ার আহমদ, সুপাতলা গ্রামের আবুধাবি প্রবাসী লুৎফুর রহমান, লাউতার মহাজন বাড়ীর মহি উদ্দিন, শ্রীধরা গ্রামের যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী যুবলীগ নেতা আব্দুল কুদ্দুছ টিটু, মাটিজুড়া গ্রামের ডাঃ আব্দুস সালাম মুক্তা প্রমুখের নাম মহতী স্বজনসেবায় মানবতার দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে। পাশাপাশি এমন দৃষ্টান্তে নাম না জানা চিত্তবান বিত্তশালীদেরকে মানবতার কাজে এগিয়ে আসার উৎসাহ যোগাবে।

করোনা সারাজীবন থাকবে না। কিন্তু “মানুষই মানুষের জন্য”- এ চরম সত্য কথাটি কোভিড-১৯ নতুন করে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল দুনিয়াবাসীকে। আল্লাহ সবার মঙ্গল করুক। সকল সৌন্দর্য দেহ ছাড়িয়ে মন পর্যন্ত পৌঁছে যাক। প্রশংসনীয় হোক সকল মঙ্গল প্রয়াস।

লেখক: সভাপতি-বিয়ানীবাজার প্রেসক্লাব।

রিপ্লাই করুন

অনুগ্রহ করে আপনার মন্তব্য লিখুন
অনুগ্রহ করে আপনার নাম লিখুন