নীড়পাতা ফিচারড গণতন্ত্র পূনরুদ্ধারে একজন শহীদ ময়েজউদ্দিনের গল্প – মোয়াজ্জেম হোসেন রাসেল

গণতন্ত্র পূনরুদ্ধারে একজন শহীদ ময়েজউদ্দিনের গল্প – মোয়াজ্জেম হোসেন রাসেল

গণতন্ত্র পূনরুদ্ধারে একজন শহীদ ময়েজউদ্দিনের গল্প

মোয়াজ্জেম হোসেন রাসেল : বাংলাদেশের স্বাধীন রাষ্ট্রের শুরুটা হয়েছিল গণতন্ত্র দিয়ে। পরাধীন থাকা অবস্থায়ও গণতন্ত্র দিয়ে নিজেদের অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলন করে গেছেন পূর্ব পাকিস্তানের মানুষ। স্বাধীনতার পর ১৯৭৫ সালে দেশের রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর আবারো গনতন্ত্রহীন হয়ে পড়ে দেশ। ঠিক এ সময়ে আন্দোলনে অনেকেই আত্মহুতি দিয়েছিলেন। সেখানে জ্বলজ্বল করা একটি নাম মো. ময়েজউদ্দিন।

১৯৩০ সালের ১৭ মার্চ তার জন্ম। ঠিক ১০ বছর আগের এই একই দিনে জন্মেছিলেন স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি, হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালী, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। সে কারণেই দুজনের রক্তে একই ধারা প্রবাহিত ছিল। গনতন্ত্র রক্ষায় নিজের জীবন উৎসর্গ করে ময়েজউদ্দিন মানুষের মনের মনিকোঠায় ঠাই করে নিয়েছিলেন। সে স্থানটি এখনো সেই আগের মতোই আছে। গনতন্ত্র রক্ষার এ বীর সেনানীর ৩৬তম শাহাদাৎবার্ষিকী ২৭ সেপ্টেম্বর। একজন সমাজসেবক ও আইনজীবি শহীদ মোঃ ময়েজউদ্দিন আজীবন মানুষের সেবা করে গেছেন। ১৯৩০ সালের ১৭ মার্চ বর্তমান গাজীপুর জেলার কালিগঞ্জ উপজেলার মোক্তারপুর ইউনিয়নের বড়হরা গ্রামের মো. ছুরত আলী ও মোসাম্মৎ শহর বানুর ঘর আলো করে পৃথিবীতে এসেছিলেন ময়েজউদ্দিন।

দেশপ্রেমিক রাজনীতিবিদ ও আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন সমাজ সেবক হিসেবে শহীদ ময়েজউদ্দিন জনতার হৃদয়ে চিরদিন বেঁচে থাকবেন। পড়ালেখার শুরুতেই নিজের মেধার পরিচয় দিতে থাকেন ময়েজউদ্দিন। ৪র্থ শ্রেণীর প্রাথমিক বৃত্তি পরীক্ষায় প্রথম স্থান অধিকার করে মেধাবী ছাত্র হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন। ১৯৪৮ সালে কালিগঞ্জ রাজা রাজেন্দ্র নারায়ন (আর.আর.এন) পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় থেকে প্রথম বিভাগে প্রবেশিকা, ১৯৫০ সালে ঢাকা কলেজ হইতে প্রথম বিভাগে উচ্চ মাধ্যমিক, ১৯৫৩ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় হতে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে বিএ (অনার্স) এবং ১৯৫৫ সালে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে এমএ পাশ করেন। ১৯৫৬ সালে সিএসপি-তে (বর্তমানে বিসিএস) কৃতিত্বের সাথে উত্তীর্ণ হয়েও স্বাধীনচেতা ময়েজউদ্দিন সরকারী চাকরি যোগদান না করে ১৯৬০ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় হতে এলএলবি পাশ করেন। পাশাপাশি পাকিস্তানবিরোধী আন্দোলনে অংশগ্রহন করে নজরে আসেন। কলেজে পড়ার সময়ই ময়েজউদ্দিন রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন। ১৯৫২’র ভাষা আন্দোলন, ১৯৫৪’র যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন, ১৯৬২’র কুখ্যাত হামিদুর রহমান কমিশনের বিরুদ্ধে আন্দোলন, ১৯৬৬’র ৬-দফা আন্দোলন ও ১৯৬৯’র গণআন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহন ও নেতৃত্ব দেন। ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনে পরিচালনায় অগ্রনী ভুমিকা রাখার পাশাপাশি ১৯৭১ সালে মহান স্বাধীনতা যুদ্ধেও অসামান্য ভুমিকা পালন করেন। আওয়ামী লীগের জন্মলগ্ন থেকেই বঙ্গবন্ধুর খুব কাছের একজন হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন। বঙ্গবন্ধুও তাকে খুব ভালবাসতেন।

এছাড়া বিভিন্ন আন্দোলন সংগ্রামে তার ভূমিকা ছিল প্রশংসনীয়। স্বৈরশাষক পাকিস্তানী গোষ্ঠীর রক্তচক্ষুকে উপেক্ষা করে ঐতিহাসিক আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা পরিচালনায় সাহসিকতার সহিত গুরুদায়িত্ব হিসেবে পালন করেন। ময়েজউদ্দিন ছিলেন দায়িত্বপ্রাপ্ত ’মুজিব তহবিল’ গঠনের আহবায়ক। আওয়ামীলীগের মনোনীত প্রার্থী হিসেবে ১৯৭০ সালে কালিগঞ্জ নির্বাচনী এলাকা থেকে ’প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য’ ও ১৯৭৩ সালে ’জাতীয় সংসদ সদস্য’ নির্বাচিত হন। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগষ্ট জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু স্বপরিবারে নিহত হওয়ার পর খন্দকার মোশতাক কর্তৃক আহুত সংসদ অধিবেশনে বিশ্বাসঘাতক খুনী মোশতাকের বিরুদ্ধে সর্বপ্রথম বক্তব্য রাখেন। এবং বঙ্গবন্ধুকে স্বপরিবারে হত্যার কৈফিয়ত চেয়ে তীব্র প্রতিবাদী ভুমিকা পালন করে অধিবেশনের সকলকে হতবাক করে দেন। ১৯৭৫’র বিয়োগান্তক ঘটনার পর তিনি বাংলাদেশ আওয়ামীলীগকে সুসংগঠিত করার কাজে নিজেকে আত্মনিয়োগ করেন ময়েজউদ্দিন। পরবর্তীতে উল্লেখযোগ্য সময় তিনি বৃহত্তম ঢাকা জেলা আওয়ামীলীগের প্রথমে সাধারণ সম্পাদক ও পরে সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। একই সময়ে তিনি ঢাকা মহানগর ও কেন্দ্রীয় আওয়ামীলীগের নেতৃত্বেও ছিলেন। পেশাগত জীবনে প্রথমে ঢাকাস্থ সিদ্বেশ্বরী উচ্চ বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেন। পরবর্তীতে আইনজীবি হিসেবে ঢাকা বার ও সুপ্রিমকোর্ট বারে নিজেকে সুপ্রতিষ্ঠিত করেন তিনি।

কুখ্যাত আইয়ুব-মোনায়েম খানের পেটোয়া বাহিনীর প্রবল বিরোধীতার মুখেও কমলাপুর ইউনিয়ন পরিষদের ’চেয়ারম্যান’ নির্বাচিত হন। এছাড়া ঢাকা মিউনিসিপ্যাল কর্পোরেশনের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের দায়িত্বও ময়েজউদ্দিন পালন করেন। রাজনীতি ও পেশাগত দায়িত্ব পালন করার পাশপাশি একজন সমাজসেবক হিসেবে নিজেকে পরিচিত করে তোলেন। ১৯৭৭ সাল হতে মৃত্যুর সময় পর্যন্ত বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির নির্বাচিত সহ-সভাপতি ও বাংলাদেশ পরিবার পরিকল্পনা সমিতির অবৈতনিক সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। এছাড়া ইন্টারন্যাশনাল প্যান প্যারেনহুড ফেডারেশন-আইপিপিএফসহ REXCO -এর সদস্য ছিলেন। এর বাইরে জঊঢঈঙ-এর প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করার পাশাপাশি বাংলাদেশ সমবায় ব্যাংকের প্রেসিডেন্টও ছিলেন ময়েজউদ্দিন। পারিবারিক জীবনও বেশ সম্মৃদ্ধ ও সফল ময়েজউদ্দিনের। ১৯৫৭ সালে ঢাকা শহরের এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারের মেয়ে বিলকিস বেগমের সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। তার স্ত্রী ব্যক্তিগত জীবনে শিক্ষকতা পেশায় নিয়োজিত ছিলেন এবং বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ ও মহিলা সমিতিসহ নানা সমাজ সেবামূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত ছিলেন। তিনি এক পুত্র ও পাঁচ কন্যা সন্তানের গর্বিত পিতা ছিলেন। জ্যৈষ্ঠা কন্যা কুইন মেহজাবিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় হতে মাস্টার ডিগ্রি অর্জন করে বর্তমানে স্বামীসহ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করছেন। দ্বিতীয় কন্যা মেহের আফরোজ চুমকি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় হইতে এমএসসি পাশ করেন। বর্তমানে তিনি বাংলাদেশ জাতীয় সংসদের গাজীপুর-৫ আসন থেকে বাংলাদেশ আওয়ামীলীগ মনোনীত প্রার্থী হিসেবে নির্বাচিত সংসদ সদস্য এবং মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। এর আগে মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্বও পালন করেন। সাংগঠনিক দক্ষতার পুরস্কার হিসেবে বাংলাদেশ আওয়ামীলীগের সর্বশেষ সম্মেলনে মহিলা বিষয়ক সম্পাদিকার পদ লাভ করেন। এ ছাড়া ১৯৯৬ সালে গাজীপুর-নরসিংদী সংরক্ষিত মহিলা আসন থেকে সংসদ সদস্য হিসেবে সুনামের সহিত দায়িত্ব পালন করেন। বাবা ময়েজউদ্দিনের দেখিয়ে দেওয়া পথে নিজেকে সমাজসেবায় আত্মনিয়োগ করেছেন চুমকি। একই সাথে সমাজ সেবামূলক আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ পরিবার কল্যাণ সমিতির সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। তার ইঞ্জিনিয়ার স্বামী সরকারী বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের উর্ধ্বতন কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তৃতীয়া কন্যা মেহের নিগার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় হতে মাস্টার ডিগ্রি পাশ করেন। চতুর্থ কন্যা মুশরাত জাবীন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়-বুয়েট হতে আর্কিটেক্ট ইঞ্জিনিয়ারিং পাশ করে বর্তমানে স্বামীসহ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করছেন। কনিষ্ঠা কন্যা মেহেরবা ফেরদৌস জয়া ইঞ্জিনিয়ারিং পাশ করে বর্তমানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করছেন। একমাত্র পুত্র ইকবাল ইউসুফ বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়-বুয়েট হতে ইঞ্জিনিয়ারিং পাশ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে প্রকৌশল বিষয়ে উচ্চতর ডিগ্রি অর্জন করে সেখানকার খ্যাতনামা প্রতিষ্ঠান SEXCO -এর উর্ধ্বতন কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে সোনার বাংলা গড়ার স্বপ্ন যখন তিরোহিত হয় তখনই ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে স্বপরিবারে হত্যার মাধ্যমে জাতির ইতিহাসকে মুছে ফেলা হয়। সেই দুর্বিসহ প্রেক্ষাপটে জাতির মুক্তির লক্ষ্যে মানুষের গনতন্ত্র, ভোট ও ভাতের অধিকার আদায়ের সংগ্রামে বর্তমান মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে দেশব্যপী স্বৈরাচার সামরিক শাষকবিরোধী আন্দোলনে উত্তাল বাংলাদেশ। সে সময় ১৯৮৪ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর বৃহস্পতিবার সারাদেশে আহুত হরতাল চলাকালে নিজ নির্বাচনী এলাকা গাজীপুর জেলার কালিগঞ্জের মাটিতে সকাল ৯.১৫ মিনিটের সময় রাজপথে মিছিলের নেতৃত্বে থাকাকালীন অবস্থায় থানার অতি নিকটে পুলিশের সহযোগিতায় স্বৈরশাষকের লেলিয়ে দেওয়া পেটোয়ো বাহিনী একজন দেশপ্রেমিক রাজনৈতিক ও আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন নেতাকে প্রকাশ্যে নৃশংসভাবে ছুরিকাঘাত করে হত্যা করে। সারাজীবন মানুষের সেবায় নিজকে অকাতরে বিলিয়ে দিলেও সেই ঘাতকরুপী মানুষের হাতেই তার মৃত্যু হয়। তার মৃত্যুতে যতটা ক্ষতি হয়েছিল গাজীপুরের কালিগঞ্জের তার চেয়েও বেশি ক্ষতি হয়েছে বাংলাদেশের। কারণ একজন রাজনীতিকের পাশাপাশি সমাজ সেবকের অভাব যে এখনো অপূর্ণই রয়ে গেছে।

লেখক : প্রকৌশলী ও ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক

mhrashel00@gmail.com

রিপ্লাই করুন

অনুগ্রহ করে আপনার মন্তব্য লিখুন
অনুগ্রহ করে আপনার নাম লিখুন