নীড়পাতা খেলাধুলা জয়তু ক্রিকেটঃ সাঙ্গ হলো বিশ্বকাপ-২০১৯

জয়তু ক্রিকেটঃ সাঙ্গ হলো বিশ্বকাপ-২০১৯

24
0

মোঃ সামসুল ইসলাম

ক্রীড়া ভাষ্যকার, বেতার ও টেলিভিশন
ফাইনাল ম্যাচ টাই, সুপার ওভার টাই। সুতরাং ইংল্যান্ড-নিউজিল্যান্ড কেউ জিতেনি, এরা কেউ হারেওনি।আজকের ফাইনাল খেলায় জিতেছে ক্রিকেট-জয়তু ক্রিকেট। এই একটি ম্যাচই এবারের আসরকে সর্বাঙ্গীন সফলের তকমা এনে দিয়েছে।
ক্রিকেটের মহারণ শেষ হলো প্রায় সপ্তাহ পেরিয়ে গেছে। ভাবছি বিশ্বকাপ নিয়ে একটি রিভিউ লিখবো, কিন্তু ব্যাটে বলে সমন্বয়টা আর হচ্ছেনা। এ নিয়ে নিজের মনের মধ্যে একটা অপরাধবোধ অনুভব করছিলাম গতকদিন। আর তা থেকেই এই লেখার অবতারণা। ক্রীড়া বিষয়ক কলাম লেখার অভ্যাস সেই বিশ্ববিদ্যালয় জীবন থেকেই। ইদানিং অনেকটা মনের আনন্দেই প্রায় লিখি। আলসেমি না করে আজ লেখাটা শুরু করলাম। আত্মবিশ্বাস আছে একবার শুরু করলে তা শেষ করবো এক দমে।
ক্রিকেট বিশ্বকাপের যাত্রা শুরু ১৯৭৫ সালে ইংল্যান্ডে। এবারের ১২তম আসরটিও বসেছিল ক্রিকেটের সেই আঁতুরঘরে। ইংল্যান্ডে এবারের আসরটি ছিল স্বগতিক হিসেবে তাদের ৫ম আয়োজন। কথায় আছে, একবার না পারিলে দেখ শতবার! এক্ষেত্রে ইংলিশদের জন্য উক্তিটি হবে, একবার না পারিলে দেখ পাঁচবার। ক্রিকেটের জনক/আবিস্কারক ইংল্যান্ডের শিরোপা না পাওয়াটা বিশ্বব্যাপী ক্রিকেট ভক্তদের কাছে একেবারেই বেমানান লাগছিল। যাহোক অবশেষে ইংলিশদের ভাগ্যে শিরোপা জুটলো। চরম নাটকীয়তা আর ভাগ্যগুণেই এবার তারা শিরোপা পেয়েছে, তা বলার অপেক্ষা রাখেনা।
আমরা ক্রিকেটের ধারাভাষ্যে প্রসংগক্রমে বিভিন্নসময়ে নানাভাবে ক্রিকেটকে সংজ্ঞায়িত করি। ক্রিকেট গৌরবময় অনিশ্চয়তার খেলা। ক্রিকেট ইজ এ্যা ফানি গেম। আমরা কেউ জানিনা পরের বলে কি অপেক্ষা করছে- তাই ক্রিকেটে এতা মজা। ফলাফল নিয়ে আমরা কেবল পূর্বানুমান করতে পারি, নিশ্চিত করে কিঝুই বলতে পারিনা। আর তাই নির্দিষ্ট ফলাফলের জন্য, শেষ বল অব্দি অপেক্ষায় থাকতে হয়। ক্রিকেট কাউকে কাঁদায় আবার একই মঞ্চে কাউকে হাসায়। সকালের রাজা দুপুর গড়িয়ে বিকেল না হতেই ফকির, এশুধু ক্রিকেটেই সম্ভব। এমন আরো কত কথা আছে ক্রিকেটকে নিয়ে।
এসব কথার উদাহরণসহ সংজ্ঞা প্রমানীত হলো ১৪ জুলাই ২০১৯ লর্ডসের ইংল্যান্ড বনাম নিউজিল্যান্ড ফাইনালে। আমি বলেছি, লর্ডস আজ ধন্য এমন একটি ম্যাচ হোস্ট করতে পেরে। এই একটি মাত্র ম্যাচ তার মোহনীয় উপস্থাপনায় সমগ্র ক্রিকেট বিশ্বকে শিহরিত করেছে। ফিরিয়ে দিয়েছে ক্রিকেটের আসল সৌন্দর্য। এটা এমন একটা স্মরনীয় ম্যাচ ছিল, যা হয়তো আমরা আমাদের জীবদ্দশায় কল্পনাও করিনি, হয়তো এই জীবনে এমন ম্যাচ আর দেখতে পাব কিনা সন্দেহ। এক কথায় অবিশ্বাস্য এবং অবিস্মরনীয়। এমন ম্যাচ শতাব্দীতেও দেখা যায় কিনা আমি কল্পনা করতে পারিনা। সেদিন আপনারা যারা ম্যাচটি দেখেছেন কিম্বা ইথারে এর ধারাবর্ণনা শুনেছেন তারাই কেবল উপলব্ধি করতে পারবেন। যারা পরে গল্প শুনেছে, স্কোরকার্ড দেখেছে, কিম্বা রিপোর্ট পড়েছে, তারা এর নির্যাস গ্রহণ করতে ব্যর্থ হয়েছে। সেদিন নিউজিল্যান্ড টসে জিতে ব্যাট করে ৮ উইকেটে ২৪১ রান করলো, জবাবে ইংল্যান্ড নির্ধারিত ৫০ ওভারে ২৪১ রান করে অলআউট হয়ে গেল। ম্যাচ টাই। খেলা গড়ালো সুপার ওভারে। ইংল্যান্ড সুপার ওভারে করলো ১৫ রান, নিউজিল্যান্ডের টার্গেট ১৬ রান কিন্তু তারাও ১৫ রান করলে ম্যাচ আবারো টাই হয়ে যায়। সুপার ওভার টাই হলে বিধি অনুযায়ী অধিক সংখ্যাক বাউন্ডারী মারায় ইংল্যান্ড জয়ী হয় এবং তারা প্রখমবারের মতো বিশ্বকাপের শিরোপা ঘরে তোলে। কিন্তু আমি সেদিন বলেছিলাম- ফাইনাল ম্যাচ টাই, সুপার ওভার টাই। সুতরাং ইংল্যান্ড-নিউজিল্যান্ড কেউ জিতেনি, এরা কেউ হারেওনি। আজকের ফাইনাল খেলায় জিতেছে ক্রিকেট- জয়তু ক্রিকেট। এই একটি ম্যাচই এবারের আসরকে সর্বাঙ্গীন সফলের তকমা এনে দিয়েছে।

স্লাইস অব লাক ক্রিকেটে খুব বেশী প্রয়োজন অর্থাৎ বড় ম্যাচ জেতার জন্য ছোট ছোট সৌভাগ্য সাথে থাকতে হয়। সমশক্তির দুই দলের লড়াইয়ে বা টুর্ণামেন্টের নকআউট স্টেজে এজাতীয় স্লাইস অব লাক নিজেদের অনুকুলে আসলে ইতিবাচক ফলাফল হয়। এবিষয়গুলো অলিখিত কিন্তু ম্যাচডেতে ম্যাচ পরবর্তি আড্ডা বা আলোচনায় এ বিষয়গুলোই একটা বড় জায়গা কেড়ে নেয়। যেমন ও অতো রানে জীবন পেয়েছিল কিম্বা তামিম যদি সেদিন রোহিতের ক্যাচটা না ছাড়তেন, মুশফিক যদি রস টেইলরের রান আউটটা মিস না করতেন, ইত্যাদি। প্রাপ্ত সুযোগের শতভাগ সৎব্যবহার যারা করবে, তারাইতো এগিয়ে যাবে। সুতরাং এগুলো দিনশেষে যথেষ্ট ম্যাটার করে।
এবারের বিশ্বকাপের চিত্রনাট্য যেভাবে এগুচ্ছিলো তাতে অনেকেই ধরে নিয়েছিলেন ১৪ জুলাই লর্ডসে লড়ছে ভারত-অষ্ট্রেলিয়া। কিন্তু সেটা ক্রিকেট এগিয়ে যাওয়ার জন্য খুব বেশি ভাল হতোনা। বরং অনেকেই চেয়েছিলেন একটি নতুন চ্যাম্পিয়ন। সেই অনেকের চাওয়ার প্রতিফলন ঘটিয়েই এবারের চিত্রনাট্য লিখলেন ভাগ্যদেবী। ক্রিকেট পেল নতুন চ্যাম্পিয়ন ইংল্যান্ডকে, যারা আবার ফুটবলের বিশ্বকাপও জিতেছে ১৯৬৬ সালে। আর তাতেই হয়ে গেল একটা বিরল রেকর্ড।
এবারের বিশ্বকাপ থেকে আমাদের প্রত্যাশা ছিল গগণচুম্বি আর সেকারনেই বুঝি আমরা অবশেষে একটু আশাহতই হয়েছি। ৩টি জয়সহ ৭ পয়েন্ট নিয়ে ১০ দলের আসরে ৮ম স্থানে থেকে শেষ করলো বাংলাদেশ। সাকিবের অসাধারণ এবং অতি মানবীয় অলরাউন্ড নৈপূণ্য, একাধিক দূর্লভ রেকর্ড, মুস্তাফিজের ব্যাক টু ব্যাক ৫ উইকেটসহ ২০টি উইকেট, মুশফিকের ব্যাটিং ধারাবাহিকতা, লিটনের ব্যাটে ক্ষণিকের ঝলক, সাঈফুদ্দিনের অলরাউন্ড সামর্থ্য। মোটা দাগে এগুলোই ছিল আমাদের প্রাপ্তি অন্যদিকে অপ্রাপ্তির খাতা ছিল বেশ পরিপূর্ণ। অথচ পাকিস্তানের সাথে শেষ ম্যাচটা জিতলে, আমরা ৫ নম্বরে থেকে শেষ করতে পারতাম। যা আমাদের জন্য অনেক বেশি গর্বের হতে পারতো।
টুর্ণামেন্টে গোড়ার দিকে বৃষ্টির কারণে ৪টি ম্যাচ পুরোপুরি পরিত্যক্ত হওয়া এবং ২টি ম্যাচ কার্টেল ওভারে সম্পন্ন হওয়ায় বেশ সমালোচনা এবং ইংল্যান্ডের বৃষ্টি ও আবহাওয়া নিয়ে এক বিস্তর গবেষণা হয়েছিল সেসময়। শেষের দিকে আর বৃষ্টি খুব বড় বাধা হয়ে দাঁড়াতে না পারলেও ভারত-নিউজিল্যান্ডের মধ্যে দুদিনের সেমিফাইনাল আমাদের জন্য ছিল বিরল অভিজ্ঞতা। উন্নতমানের লেটেষ্ট প্রযুক্তির ব্যবহারে একটি মানসম্পন্ন প্রডাকশন উপহার দিতে চেষ্টা করেছে আইসিসি। তথাপি অনেক ম্যাচে ফিল্ড আম্পায়ারদের একাধিক ভুল এবং বিতর্কিত সিদ্ধান্ত ম্যাচের মোমেন্টাম বদলে দিয়েছে। আবার নতুন করে যুক্ত হয়েছে সফট সিগনাল! টিভি আম্পায়ার তো ফিল্ড আম্পায়ারের রক্ষাকবচ হিসেবেই ব্যবহিৃত হচ্ছে দেখলাম। কথা উঠছে রিভিউ একটার বদলে দুইটা রাখলে ক্ষতি কি?
ব্যাট-বলে আসাধারণ পারফরমেন্স দেখানো সাকিবের হাতে টুর্ণামেন্ট সেরার পুরস্কার না পাওয়া অনেকেই মেনে নিতে পারেননি। তবে অনেকগুলি নতুন রেকর্ডস, ব্যক্তিগত রান এবং উইকেটের তালিকায় নিয়মিত ওঠানামা ছিল দেখার মতো। ৩১টি সেঞ্চুরী ইনিংস, মোহাম্মদ শামি ও ট্রেন্ট বোল্টের হ্যাট্রিক এবং ১০টি ৫ উইকেট শিকারের অভাবনীয় দৃশ্য দেখা গেছে এবার। ব্যাটে বলে ইভেনলি ব্যালান্স ছিল এবারের বিশ্বকাপের পুরো আসর। ২/৩ টি লো স্কোরিং ম্যাচের পাশাপাশি বেশকিছু মাঝারি টোটালকে ডিফেন্ড করে সংশ্লিষ্ট দলগুলো জয় পাওয়ায় টুর্ণামেন্টটা বেশ জমজমাট এবং প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হয়েছে বলা যায়।
অনেক রথি মহারথির বিদায়ের মিছিলে ঐ একই পথ বেয়ে এসেছে অনেক সম্ভাবনাময় তরুণ তুর্কি, যারা আগামীদিনের ক্রিকেটকে আরো রঙিন করতে সক্ষম। বিশ্বকাপের বিশ্বমঞ্চে হয়তো আর দেখা যাবেনা- মাশরাফি মরতুজা, লাসিথ মালিঙ্গা, শোয়েব মালিক, মাহেন্দ্র সিং ধোনি, মোহাম্মদ হাফিজ, ওয়াহাব রিয়াজ, মরগান, প্লাংকেট, এ্যারন ফিঞ্চ, ডেভিড ওয়ার্ণার, স্টিভ স্মিথ. মিচেল স্টার্ক, মঈন আলী, আদিল রশিদ, ইমরান তাহির, জেপি ডুমিনি, এ্যানজেলো ম্যাথিউজ, ক্রিশ গেইল, আন্দ্রে রাসেল, রস টেইলরের মতো মহারথিদের।
অনেক সম্ভাবনাময় তরুণ যারা নজর কেড়ে নিলেন তারা হলো- আভিস্কা ফার্নান্দো, এ্যালেক্স ক্যারী, জেমস ভিন্স, লিটন দাস, মোহাম্মদ সাঈফুদ্দিন, কাসুন রাজিথা, জোফরা আর্চার, বেহেনডর্ফ, ফখর জামান, ইমাম উল হক, শাহীন আফ্রিদি, সাই হোপ, রিষভ পান্ট, হার্দিক পান্ডিয়া, মিচেল স্যান্টনার, প্রমুখ।
আবার শুরু হলো দির্ঘ চার বছরের অপেক্ষা। পরের আসর বসছে ভারতে- ২০২৩ সালে। সেই আসরে কাঙ্খিত সাফল্য পেতে সঠিক ও সুন্দর পরিকল্পনায় এখনই শুরু করতে হবে আমাদের। অন্যথায় স্বপ্ন ভঙ্গের হতাশায় পুড়তে হবে আবারো।

রিপ্লাই করুন

অনুগ্রহ করে আপনার মন্তব্য লিখুন
অনুগ্রহ করে আপনার নাম লিখুন