নীড়পাতা শিল্প সাহিত্য গল্প দখিন দুয়ার খোলা (পর্ব-৫)-আয়শা জাহান নূপুর

দখিন দুয়ার খোলা (পর্ব-৫)-আয়শা জাহান নূপুর

দখিন দুয়ার খোলা
পর্ব# ৫

এখন এখানে দুপুর। বহুতল ভবনের উচু তলায় দাঁড়ালে নিজেকে ‘রাজন’ মনে হয়। মনের ভিতর যে কত অন্ধ অলিগলি আছে! কখন কোন পথে কী সুখ আছে তা হয়তো মনের জানা হয় না। শর্মিলার এক বান্ধবী ইডেন মহিলা কলেজে পড়ত। হলে সীট না পেয়ে সে আজীমপুর সরকারী কোয়ার্টারে থাকত। মেয়েটা প্রতিদিন নিয়মকরে ম্যাটার্নিটির পাশে ওভার ব্রিজে গিয়ে দাঁড়াত সূর্যাস্তের সময়। তার নাকি মনে হতো একটা উচু জায়গা থেকে সে একটা দিনের বিদায় দেখতে পাচ্ছে। কত কিছু যে হয় আমাদের মনে!

মাহজাবীন মেবিনের নিউজটায় নতুনত্ব আসছে। কোন সুইসাইড নোট পাওয়া না গেলেও একটা রহস্যজনক ঘটনা ঘটে গেছে সবার অলক্ষ্যে। এক তরুন জায়গা করে নিয়েছে গল্পের মূল পর্বে। পরিমানে খুব বেশি না হলেও প্রয়োজনীয় কিছু তথ্য রয়ে গেছে তার সেল ফোন এবং ল্যাপটপে। পাঠকের নজর কাড়ার জন্য তা ই যথেষ্ট । লেখিকার মৃত্যু নতুন এক উপন্যাসের শুভ প্রকাশ ঘটিয়ে গেছে।

শর্মিলা অফিসে ছুটির কথা বলল না। সে জানে এই মূহুর্তে তার গেলে চলবে না। সৌমেন আর ফিরোজ ভাই কি নিয়ে যেন কথা বলছিলেন। শর্মিলার দিকে তাকিয়ে হেসে সৌমেন বললেন, আমি আগেই টের পেয়েছিলাম, কেস এটা না হয়ে যায় না! দেখলেন তো, ঠিক মিলে গেলো।” ফিরোজ ভাই, ‘প্রতিদিনের বিশ্ব’ পাতা দেখেন, গায়ের রং শ্যামলা, সর্বদা হাসিখুশি। চটপটে স্বভাবের, চশমা পরেন। তাকে বলা হয় মিস্টার এসপেক্টটেট। মেয়েরা তাকে পছন্দ করেন, তিনিও নারী সঙ্গ উপভোগ করেন। কিন্তু বিয়ে কেন করছেন না, সে রহস্যে আজও অপ্রকাশিত।

গত বছর ১৪ ই ফেব্রুয়ারি, মেবিনের জন্মদিনে ‘লেখক কর্নার’ নামের এক সংগঠনের আয়োজন চলছিলো। অসংখ্য গুনীজন এসেছিলেন তাকে জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানাতে। এক পর্যায়ে একজন পাঠক অনুরোধ করেছিলেন প্রচলিত নিয়ম ভেঙ্গে একটা উপন্যাস লেখার। নিয়মের বাইরে দাঁড়িয়ে আওয়াজ তোলার কথা বলেছিল সেদিন সেই পাঠক ছেলেটি। বলেছিলো আপনার জন্মদিনেই সত্য বলার সাহস পাচ্ছি, ইদানিং আপনার লেখায় প্রাণ নেই। খুব পানসে লাগে যখন দেখি নতুন লেখকদের মতো আপনি বিষয়ের বাহির দিয়ে হেঁটে যান। প্লিজ, নিজেকে ভাঙ্গুন, চুরমার করে আবার লিখুন। মেবিন কিছু না বলে মুখে মিষ্টি হাসি ধরে রেখে একবার ভালো করে দেখে নিয়েছিলো ছেলেটিকে।

মাহজাবিন মেবিন, সে পয়তাল্লিশ বছরের একজন নারী। বয়স তাকে নিজের মতো করে রুখতে পারে নি। উজ্জ্বল শ্যাম বর্নের পাঁচ ফুট ছয় ইঞ্চির একজন তরুনীই তাকে মনে হবে সবার। চমৎকার গুছিয়ে কথা বলেন নির্ভূল ভাবে। বুদ্ধিদীপ্ত। পোষাক ও চলনে পরিশীলিত যদিও অনেকে এর অপব্যাখ্যা ও করেন। কথা বলতে থাকলে চারদিক মাতিয়ে রাখেন। তবে তার আশে পাশে পুরুষের একটা ভীর চোখে পড়ার মতো। তবে তারা যে প্রশ্রয় পায় না তা সহজেই বোঝা যায়।

সেদিনের জন্মদিনে কবি, লেখকেরা তাকে ঘিরে প্রশংসার যে বন্যা ডেকেছিলো, মেবিন জানেন, সত্তর পার্সেন্টেই তার মন পাওয়ার জন্য। এদের সকল প্রার্থণা তাকে আরো সতর্ক করে।
সেদিনের সে আয়োজনে প্রাচ্য এসেছিলেন শেষ সময়ে। তারা একসাথে বেরও হয়েছিলেন। চোখে পড়ার মতো এটা বিশেষ কিছু নয় তবুও ভক্তকূল তাকে নিয়ে ভেবেছিলো ভালোবেসে।

মেবীন বেড়িয়ে যেতেই প্রকাশক মোস্তাফিজ সুজনকে লক্ষ্য করে তিমির রায় বললেন, ” বুঝলেন ভায়া, সুন্দরের জয় সর্বত্র। সুন্দরী নারী তাও আবার লেখক! তাদের জন্যই তো পৃথিবী! কি বলেন?”
এই ধরণের আলোচনায় মোস্তাফিজ সাহেবের কোন আগ্রহ দেখা গেল না। তিনি শুধু বললেন, ” তিমির, আপনার কথাগুলো উনি শুনলে নিশ্চয়ই খুশি হতেন। জন্মদিনের শুভেচ্ছা বার্তা হিসেবে বেশ ভালো। ভবিষ্যতে দেখা হলে সামনাসামনি সুন্দরের প্রশংসা করবেন। এতে সুন্দরের মূল্যায়ন হয়।”
আবুল বাতেন রাশিদ, প্রাবান্ধিক, হাসতে হাসতে বললেন, ” বাংলাদেশ নারীমাতৃক দেশ, একথা আমি বহুবার বলেছি। আপনার ভাগে কম পড়বে না, তিমির সাহেব! একটু চোখ কান খোলা রাখুন। পেয়ে যাবেন।”
ক্রমেই পরিস্থিতি বেশ এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে। রাতও বাড়ছে। একে একে সবাই পথে নামলেন। পথ অন্ধকার নয়, আলোকিত। তাহলে আমরা যাদের আলোকিত মানুষ ভাবি তাদের ভিতরটা অন্ধকার কেন?

রিপ্লাই করুন

অনুগ্রহ করে আপনার মন্তব্য লিখুন
অনুগ্রহ করে আপনার নাম লিখুন