নীড়পাতা শিল্প সাহিত্য নানকার কৃষক বিদ্রোহ – আব্দুল ওয়াদুদ

নানকার কৃষক বিদ্রোহ – আব্দুল ওয়াদুদ

নানকার কৃষক বিদ্রোহ

আব্দুল ওয়াদুদ

১৮ আগষ্ট, ৭১ তম ঐতিহসিক নানকার কৃষক বিদ্রোহ দিবস। বৃটিশ আমলের ঘৃন্য নানকার প্রথা ও জমিদারী ববস্থার বিরুদ্ধে সংগ্রাম করতে গিয়ে ১৯৪৯ সালের এই দিনে বিয়ানীবাজার উপজেলার সানেশ্বর ও উলুউরি গ্রামের মধবর্ত্তী স্থানে ইপিআরের গুলিতে নিহত হোন ৫ জন কৃষক । ব্রজনাথ দাস (৫০) কটুমনি দাস (৪৭) প্রসন্ন কুমার দাস (৫০) পবিত্র কুমার দাস (৪৫) অমূল্য কুমার দাস (১৭) ও ১৫ দিন আগে জমিদারের লাঠিয়ালদের হাতে নিহত রজনী দাস সহ ছয়জন কৃষক তাদের বুকের তাজা রক্ত দিয়ে পূর্বসূরীদের ঋণ শোধ করেন। রক্তাক্ত পরিসমাপ্তি ঘটে নানকার আন্দোলনের। আর তারই ধারাবাহিকতায় ১৯৫০ সালে সরকার জমিদারী প্রথা বাতিল ও নানকার প্রথা রদ করে কুষকদের জমির মালিকানার স্বীকৃতি দিতে বাধ্য হয়। বাঙালি জাতির সংগ্রামের ইতিহাসে বিশেষ করে অধিকারহীন মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য যে সকল গৌরবমন্ডিত আন্দোলন বিদ্রোহ সংগঠিত হয়েছিল তার মধ্যে নানকার বিদ্রোহ অন্যতম।
উর্দূ শব্দ নান এর বাংলা প্রতিবাদ ‘রুটি। আর রুটির বিনিময়ে যারা কাজ করতেন তাদেরকে বলা হত নানকার। বৃটিশ আমলে সামন্তবাদী ব্যবস্থার সবচেয়ে নিকৃষ্টতম শোষণ পদ্ধতি ছিল এই নানকার প্রথা। নানকার প্রজারা জমিদারের দেওয়া বাড়ি ও সামান্য কৃষি জমি ভোগ করতো। কিন্তু ঐ জমি বা বাড়ির তাদের মালিকানা ছিল না। তারা বিনা মজুরিতে জমিদার বাড়িতে বেগার খাটত। চুন থেকে পান খসলেই তাদের উপর চলতো অমাুষিক নির্যাত॥ নানকার প্রজার জীবন ও শ্রমের উপর ছিল জমিদারের সীমাহীন অধিকার।
নানকার আন্দোলনের সংগঠক সমরেড অজয় ভট্টাচার্যের দেওয়া তথ্য মতে, সে সময় বৃহত্তর সিলেটের ৩০ লাখ জনসংখ্যার ১০ ভাগ ছিল নানকার এবং নানকার প্রথা মূলত: বাংলাদেশের উত্তর থেকে পূর্বাঞ্চলে অর্থাৎ বৃহত্তর সিলেটে চালু ছিল। ১৯২২ সাল থেকে ১৯৪৯ সাথে পর্যন্ত কমিউটিষ্ট পার্টি ও কৃষক সমিতির সহযোগিতায় বিয়ানীবাজার, গোলাপগঞ্জ, বড়লেখা কৃলাউড়া, বালাগঞ্জ, ধর্মপাশা থানায় নানকার আন্দোলন গড়ে ওঠে।
ঐতিহাসিক নানকার বিদ্রোহের সূতিকাগার ছিল বিয়ানীবাজার থানা। সামন্তবাদী শোষণ ব্যবস্থার বিরুদ্ধে বিয়ানীবাজার অঞ্চলের নানকার ও কৃষকরা সর্বপ্রথম বীরত্বপূর্ণ সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়ে। লাউতা বাহাদুরপুর অঞ্চলের জমিদারা ছিল অতিমাত্রায় অত্যাচারী। তাদের অত্যাচারে নানকার, কৃষক সবাই ছিল অতিষ্ঠ। লোক মুখে শোনা যায়, বাহাদুরপূর জমিদার বাড়ির সামনে রাস্থায় সেন্ডেল বা জুতা পায়ে হাঁটা যেত না। ছাতা টাঙ্গিয়ে চলা ও ঘোড়ায় চড়াও ছিল অপরাধমূলক কাজ। কেউ এর ব্যতিক্রম করলে তাকে কঠোর শাস্থি দেওয়া হতো।
জমিদারদের এহেন অত্যাচারে অতিষ্ঠ হলেও তার শক্তির সামনে দাঁড়িয়ে প্রতিবাদ করার সাহস কারোরই ছিল না। শোনা যায় নিজের ঘরের দরজা বন্ধ করেও কেউ জমিদারদের বিরু কথা বলতে সাহস পেত না। দিনে দিনে জমিদারদের অত্যাচার বাড়ত থাকে সেই সাথে বাড়তে থাকে মানুষের মনের ক্ষোভ, এই অনাচারের প্রতিকার চায় সবাই। তাই গোপনে গোপনে চলে শলাপরামর্শ। এ সময় নানকার ও কৃষকদের সংগঠিত করতে কষক সমিতি ও কমিউনিষ্ট পার্টি সক্রিয় হয়। অজয় ভট্টাচার্যের নেতৃত্বে চলতে থাকে নানকার কৃষকসহ সকল নির্যাতিত মানুষকে সংগঠিত করার কাজ । একসময় নানকার কৃষক ঐক্যবদ্ধ হয়ে প্রকাশ্য বিদ্রোহ করে জমিদারের বিরুদ্ধে বন্ধ হয়ে যায় খাজনা দওয়া এমনকি জমিদারদের হাট-বাজারের কেনাকাটা পর্যন্ত বন্ধ করে দেয়া হয়। বিভিন্ন জায়গায় জমিদার ও তার লোকজানকে ধাওয়া করে তাড়িয়ে দেয়ার ঘটনাও ঘটে।
নানকার ও কৃষকের প্রকাশ্য বিদ্রোহে ভীত সন্ত্রস্থ জমিদাররা পাকিস্থান সরকারের শরণাপন্ন হয়ে এ অঞ্চলের নানকার কৃষকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার আবেদন করে। জমিদারদের প্ররোচনায় পাকিস্থান সরকার বিদ্রোহ দমনের সিদ্ধান্ত নেয়।
১৮ আগষ্ট ১৯৪৯ সাল। ভোরের সূর্য ওঠার সাথেসাথে পাকিস্তান সরকারের ইপিয়ার ও জমিদারের পেটোয়া বাহিনী আক্রমণ করে সানেশ্বরে। ঘুমন্ত মানুষ শুকুনের আচমকা ঝাপটায় ঘুম ভেঙ্গে দিগবিদিক পালাতে থাকে। সানেশ্বর গ্রামের লোকজন পালিয়ে পার্শ্ববর্তী উলুউরিতে আশ্রয় নেয়। উলুউরি গ্রামে পূর্ব থেকেই অবস্থান করছিলেন নানকার আন্দোলনের নেত্রী অপর্ণা পাল, সুষমা দে, অসিতা পাল ও সুরথ পাল। তাদের নেতৃত্বে উলুউরিও সানেশ্বর গ্রামের কৃষক নারী পুরুষ সুরকারী রাহিনীর মুখোমুখে দাঁড়াবার প্রস্তুতি নেয় এবং লাটিসোটা, হুজা, ঝাটা ইত্যাতি নিয়ে মরণ ভয় তুচ্ছ করে সানেশ্বর ও উলুউরি গ্র্রামের মধ্যবর্ত্তী সুনাই নদীর তীরে সম্মুখ যুদ্ধেলিপ্ত হয় সরকারি ও জমিদার বাহিনীর সাথে।
কিন্তু ইপিআরের আগ্নেয়াস্ত্রের সামনে লাটিসোটা নিয়ে বেশিক্ষণ টিকতে পারেনি কৃষকরা। ঘটনা স্থলেই ঝরেন পড়ে ৬টি তাজা প্রাণ। আহত হোন হৃদয় রঞ্জন দাস, দীননাথ দাস, অদ্বৈত চরণ দাসসহ অনেকে। বন্দি হোন এই আন্দোলনের নেত্রী অপর্ণা পাল, সুষমা দে, অসিতা পাল ও উলুউরি গ্রামের প্রকাশ চন্দ্র দাস হিরণ, বালা দাস, প্রকাশ চন্দ্র দাস হিরণ, বালা দাস, প্রিয়মণি দাস, প্রহাদ চন্দ্র দাস ও মনা চন্দ্র দাস। বন্দীদের উপর সত্তা অপর্ণা পালের গর্ভপাত ঘটে। পালিয়ে যাওয়া বিদ্রোহীদের ধরার জন্য ক্যাম্প্ বসানো হয় সানেশ্বর ও উলুউরি গ্রামে । এ ঘটনর পরন আন্দোলন উত্তাল হয় সারাদেশ। অবশেষে ১৯৫০ সালে প্রবল আন্দোলনের মুখে সরকার জমিদারি প্রথা বাতিল ও নানকার প্রথারদ করে কৃষকদের জমির মালিকানা দিতে বাধ্য হয়।
১৯৯১ সালে নানকার আন্দোলনের শহিদ স্বরণে স্মৃতিসৌধের ভিত্তিপ্রস্থর স্থাপন করেছিলেন সাবেক শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ এমপি। এরপর ১৭ বছর পর ২০০৮ সালে বিয়ানীবাজার সাংস্কৃতিক কমান্ডের উদ্যোগে সানেশ্বর ও উলুউরির মধ্যবর্তী স্থানের যে মাঠে নানকার বিদ্রোহ সংঘটিত হয়েছিল সেখানে একটি স্মৃতি সৌধ নির্মান করা হয়। স্মৃতিসৌধের উদ্ভোধন করেন শিক্ষামন্ত্রী নুরল ইসলাম নাহিদ এম.পি।
প্রতি বছর বিয়ানীবাজারে ১৮ আগস্ট নানকার কৃষক বিদ্রোহ দিবস পালন হয় যথাযোগ্য মর্যাদায়।
নানকার কৃষক বিদ্রোহো ছিল পাকিস্থান সরকারের বিরুদ্ধে বাঙ্গালীর প্রথম সফল আন্দোলন । এই বিদ্রোহ এবং ৬ জন কৃষকের আত্মত্যাগের ফলেই সরকার জমিদারি প্রথা বাতিল ও নানকার প্রথা রদ করে কৃষকদের জমির মালিকানা দিতে বাধ্য হয়েছিল। তাই বিয়ানীবাজারের মানুষ শ্রদ্ধার সাথে স্বরণ করে নানকার কৃষক বিদ্রোহের ৬ জন বীর শহিদকে। সুনাই নদীর বুকে এখনো মাঝির কন্ঠে শোনা যায় ‘ ডাকে ঐ ডাকেরে রজনী, প্রমন্ন ,অমুল্্য,পবিত্র ,চটই কটই ডাকে ডাকে কুটুমনি’

আবদুল ওয়াদুদ: সাংবাদিক , সভাপতি বিয়ানীবাজার সাংস্কৃতিক কমান্ড, সাধারণ সম্পাদক উপজেলা শিল্পকলা একাডেমি বিয়ানীবাজার

রিপ্লাই করুন

অনুগ্রহ করে আপনার মন্তব্য লিখুন
অনুগ্রহ করে আপনার নাম লিখুন