নীড়পাতা বাংলাদেশ সিলেট পঞ্চখণ্ডের গুণী ব্যক্তি #টি_আলী_স্যার (১৯১৩-২০০০)

পঞ্চখণ্ডের গুণী ব্যক্তি #টি_আলী_স্যার (১৯১৩-২০০০)

2
0

আতাউর রহমান

জাতি গঠনের অন্যতম এক কারিগর পঞ্চখণ্ডের সন্তান তজম্মুল আলী। যিনি ‘টি. আলী স্যার’ নামে সকলের কাছে পরিচিত ছিলেন। এক আদর্শের প্রতীক ও ন্যায়পরায়ণ চরিত্রের পথিকৃৎ ‘টি. আলী স্যার’-এর সম্মানার্থে হবিগঞ্জ সরকারী উচ্চ বিদ্যালয়ের সম্মুখস্থ ক্রস সড়কটি এখন ‘টি আলী স্যার’ সড়ক নামে পরিচিত।

#জন্ম:
তজম্মুল আলী ১৯১৩ সনের ৩০ এপ্রিল বিয়ানীবাজার উপজেলার লাউতা ইউনিয়নে কালাইউরা গ্ৰামের এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম আনজু মিয়া ও মাতার নাম খতিজা বিবি। তিনি ছিলেন বাবা-মার কনিষ্ঠ সন্তান।

#শিক্ষাজীবন :
তজম্মুল আলীর লেখাপড়া শুরু নিজ গ্রামের পাঠশালায়। এরপর তিনি জলঢুপ মধ্যবঙ্গ উচ্চ বিদ্যালয় ও ভারতের শিলচরে অবস্থিত এক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অধ্যয়ন করে নরমাল (পণ্ডিত) ডিগ্রী অর্জন করেন।

#কর্মজীবন :
তজম্মুল আলীর কর্মজীবন শুরু হয় মহান পেশা শিক্ষকতা দিয়ে। তিনি ১৯৩৫ সনে মৌলভীবাজার জেলার বড়লেখা উপজেলার সুজাউল মাদ্রাসায় সহকারি শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন। তাঁর পরবর্তী কর্মস্থলের নাম বিয়ানীবাজারের মাথিউরা প্রাথমিক বিদ্যালয়। এখানে ৫ বছর ব্যাপি তিনি প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৪২ সনে তিনি বদলি হয়ে ভারতের বদরপুর ভাঙ্গা প্রাইমারি স্কুলে যোগদান করেন। এখানে ২ বছর চাকুরির পর ১৯৪৪ সনে তিনি প্রাথমিক স্তর ছেড়ে করিমগঞ্জ উচ্চ বিদ্যালয়ে শিক্ষকতায় যোগ দেন। ১৯৪৫ সনে তিনি সহকারি শিক্ষক হিসেবে সুনামগঞ্জ সরকারী উচ্চ বিদ্যালয়ে পাড়ি দেন। একই বছর অজ্ঞাত কারণে তাঁকে শিলং সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে আবার যোগদান করতে হয়। সেখান থেকে বদলী হন হবিগঞ্জ সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে। এরপর বদলি ভোগান্তি আসেনি। তিনি শিক্ষকতার পাশাপাশি এ স্কুলের মুসলিম ছাত্রাবাসের হল সুপারের দায়িত্ব পালন করতেন। ১৯৭৮ সনে তিনি এ প্রতিষ্ঠানে ৩১ বছর কর্ম সম্পাদন করে সিনিয়র শিক্ষক হিসেবে অবসর গ্রহণ করেন। টি. আলী স্যার অবসর পরবর্তী আমৃত্যু ২২ বছর পৈতৃক বাড়িতে জীবনযাপন করলেও স্মৃতিময় কর্মস্থলে আর তাঁর পরিদর্শন করা হয়নি। এই আত্মজার কারিগর তজম্মুল আলী নিজ উপজেলা বিয়ানীবাজারেও ছিলেন লোকচক্ষুর অন্তরালে।

#হোস্টেল_সুপার_টি_আলী:
টি. আলী স্যার স্বীয় কর্মগুণে শিক্ষার্থীদের ভালোবাসা আর সকল শ্রেনী-পেশার মানুষের আপনজন ছিলেন। ব্যক্তি জীবনে তিনি ছিলেন জেদী এবং তেজস্বী প্রকৃতির লোক। তাঁর প্রাণ ছিল পুষ্পের মত কোমল। তিনি হোস্টেল সুপার হিসেবে শিক্ষার্থীদেরকে বাবার মতো শাসন করতেন, গুরু হয়ে শিক্ষা দিতেন এবং বন্ধু হয়ে ভালোলাগার গল্প বলার দক্ষ কারিগর ছিলেন।

শিক্ষকতার নেশা, হোস্টেল সুপারের দায়িত্ব ও সেকেলের যোগাযোগ ব্যবস্থার দূরাবস্থায় নিজ বাড়ি আসা খুব কমই হতো। সেই সুবাদে শিক্ষার্থীদের নিয়ে গড়ে উঠে তাঁর হোস্টেল পরিবার। এভাবে টি. আলী নিজের অজান্তেই নিজ পরিবারের সদস্যদের কাছে মেহমান হয়ে উঠেন। দারা, পুত্র, পরিবারের চাহিদার চেয়ে হোস্টেল শিষ্যদের চাহিদাকে তিনি বেশি প্রাধান্য দিতেন। পরিবারের সদস্যদের আক্ষেপ তিনি বুঝতেন। কিন্তু দায়িত্বপরায়ণ টি. আলী স্যার জীবদ্দশায় এ নিয়ে কোন আপসোসও করেনি।

এ পথপ্রদর্শক শিক্ষকের সম্মানার্থে হবিগঞ্জবাসী তাঁর কর্মস্থল হবিগঞ্জ সরকারী উচ্চ বিদ্যালয় সম্মুখস্থ ক্রস সড়কটির নতুন নাম দিয়েছে ‘টি আলী স্যার’ সড়ক। হবিগঞ্জের স্থানীয় সংসদ সদস্য এডভোকেট আবু জাহির এম.পি এ সড়কটি উদ্বোধন করে তিনিও এখন ইতিহাসের অংশ।

তজম্মুল আলী শিক্ষকতায় অতি সাধারণ অবস্থা থেকে শ্রম, ধৈর্য, সাহস ও সততার বলে নিজেকে একজন শ্রদ্ধাবান শিক্ষকে পরিণত করে তুলেন। জ্ঞান-গরিমায় বিচরণকারী টি. আলী স্যার সম্পর্কে তাঁরই ছাত্র হবিগঞ্জের প্রাজ্ঞলোক তোফায়েল আহমদ বলেন, স্যারের গঠন আকৃতি খাঁটো হলেও তিনি মেধা ও মননশীলতায় ছিলেন অতি উচ্চমানের পণ্ডিত, আর পাঠদানে ছিলেন যত্নবান। তাঁর কণ্ঠস্বর ও সাহস ছিল স্মরণযোগ্য। হবিগঞ্জ শহরে হোস্টেল সুপার হিসেবে এতই সমাদৃত ছিলেন যে, শহরে কোথাও ছাত্ররাজনীতির নামে সংঘাতের আবাস পেলে শহরের শান্তিপ্রিয় লোকজন টি. আলী স্যারের সহায়তা নিতেন। ছাত্রাবাস থেকে টি. আলী স্যারকে ঘটনাস্থলে কেউ কেউ নিয়ে আসতেন। স্যারের উপস্থিতি মানে শিষ্যদের মাথা নিচু করে দৌড় প্রতিযোগিতা দেখা। এভাবে অসংখ্য সংঘাত থেকে হবিগঞ্জ শহরের মানুষ রক্ষা পেত। আর হবিগঞ্জ সরকারি স্কুলের আরেক ছাত্র দেশের প্রখ্যাত গুণী শিল্পী সুবীর নন্দীর মতে, টি. আলী স্যার ছিলেন একজন দায়িত্বশীল রসিক স্বভাবের লোক। আর স্কুলের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক হিসেবে টি.আলী স্যার স্বল্পভাষী হিসেবে সকলের নিকট সমাদৃত ছিলেন। পাশাপাশি তিনি ছিলেন ভীষণ কাব্যপ্রেমী ও সংগীত প্রেমী। এ রকম শ্রদ্ধা ও সম্মানের মুকুট ক’জনার ভাগ্যে জুটে!

#স্বীকৃতি_ও_সম্মাননা:
তজম্মুল আলী স্যার যে বিয়ানীবাজারের সন্তান- সে কথা হবিগঞ্জের মানুষ চিন্তায়ই নিতো না। যে কারণে হবিগঞ্জ সরকারি স্কুল সম্মুখস্থ শহরের ক্রস রোডের নাম এখন ‘টি. আলী স্যার রোড’। এদিকে তাঁর পারিবারিক সদস্যদের উদ্যোগে বিয়ানীবাজার জলঢুপ উচ্চ বিদ্যালয়ে “টি. আলী মেমোরিয়াল লাইব্রেরি” ও অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষকদেরকে জীবদ্দশায় সম্মান প্রদর্শনের লক্ষ্যে “টি. আলী স্যার ফাণ্ডেশন” প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। তাঁর সম্মানে বের হয়েছে “শিক্ষাব্রতী মহানপূরুষ টি আলী স্যার” নামক স্মারক গ্রন্থ।

#মৃত্যু:
এই গুণী শিক্ষক তজম্মুল আলী ২০০০ সনের ২৮ ডিসেম্বর ইহকালের মায়া ত্যাগ করে পরকালে পাড়ি দেন। এ জনপ্রিয় শিক্ষককে কোন ক্রমেই ভুলিতে চাই না, ভুলে থাকা যায় না।

#লেখক: শিক্ষাবিদ ও কলামিস্ট। প্রধান শিক্ষক- দাসউরা উচ্চ বিদ্যালয়। সভাপতি – বিয়ানীবাজার প্রেসক্লাব।

রিপ্লাই করুন

অনুগ্রহ করে আপনার মন্তব্য লিখুন
অনুগ্রহ করে আপনার নাম লিখুন