নীড়পাতা সমকালীন সংবাদ বাংলাদেশ পঞ্চখণ্ডের গুণী ব্যক্তি মাওলানা_আতহার_আলী (১৮৯৪ -১৯৭৬)

পঞ্চখণ্ডের গুণী ব্যক্তি মাওলানা_আতহার_আলী (১৮৯৪ -১৯৭৬)

4
0

আতাউর রহমান:

দেশ বিখ্যাত হযরত মাওলানা আতহার আলী (রহঃ) ছিলেন ইসলামি চিন্তা ও চেতনার এক প্রজ্জ্বলিত মশাল। তিনি ছিলেন রাজনীতিবিদ ও পার্লামেন্ট সদস্য। তিনি নেজামে ইসলাম পার্টির প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ছিলেন। তিনি ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলন এবং আইয়ুব খান বিরোধী আন্দোলনসহ প্রতিটি জাতীয় সংগ্রামে অংশ গ্রহণ করেন।

#প্রারম্ভিক_জীবন :
আতহার আলী ১৮৯৪ সালে ব্রিটিশ ভারতের বেঙ্গল প্রেসিডেন্সির অন্তর্গত সিলেটের বিয়ানীবাজার উপজেলার মুড়িয়া ইউনিয়নের সুপ্রাচীন ঘুঙ্গাদিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবার নাম মুন্সী মোহাম্মদ আজিম। স্থানীয় মাদ্রাসায় অধ্যয়ন শেষে আতহার আলী ঝিঙ্গাবাড়ি আলিয়া মাদ্রাসা থেকে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা লাভ করেন। এরপর তিনি মুরাদাবাদ কাসেমিয়া, রামপুর আলিয়া মাদ্রাসা, মাজাহেরে উলুম সাহারানপুর ও দারুল উলুম দেওববন্দে উচ্চশিক্ষা অর্জন করেন। তিনি হযরত মাওলানা আশরাফ আলী থানভি (রহঃ)-র ছাত্র ছিলেন।

কর্মজীবনের প্রথম লাইন ওলা লেখো–

#কর্মজীবন:
শিক্ষকতার মাধ্যমে আতহার আলীর কর্মজীবন শুরু হয়। তিনি সিলেট ঝিঙ্গাবাড়ি আলীয়া মাদ্রাসা ও কুমিল্লার জামিয়া মিল্লিয়াসহ অন্যান্য মাদ্রাসায় শিক্ষকতা করেন। ১৯০৯ সালে কয়েকজন বিদ্যোৎসাহী ব্যক্তির আমন্ত্রণে ও তাঁর মুর্শিদ হযরত মাওলানা আশরাফ আলী থানভি (রহঃ)-র নির্দেশে তিনি কিশোরগঞ্জ গমন করেন। সেখানে মুর্শিদ আশরাফ আলী থানভি (রহঃ)-র সান্নিধ্যে একাধারে তিন বছর অতিবাহিত করেন। এ সময় তিনি বাতিনী ইলমের খেলাফত লাভ করেন।
তাঁরই প্রচেষ্ঠায় কিশোরগঞ্জে ইসলামি শিক্ষা বিস্তারের জাগরণ ঘটে। তিনি কিশোরগঞ্জ মসজিদের ইমাম নিযুক্ত হন। ব্রিটিশ শাসনের শেষ দিকে হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গায় মসজিদ রক্ষার্থে স্থানীয় ক’জন মুসলমান শাহাদাৎ বরণ করেন। সেই মসজিদটি পরবর্তী সময়ে ‘শহীদী মসজিদ’ নামে পরিচিতি লাভ করে। যে মসজিদের উপর তিনি ‘খানকায়ে আশরাফিয়া’ প্রতিষ্ঠা করেন।

#রাজনীতি :
ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনে হযরত মাওলানা আতহার আলী( রহঃ) অংশগ্রহণ করেন। ভারত বিভক্তির পূর্বে তিনি জমিয়তে উলামায়ের সভাপতি নির্বাচিত হন। নবগঠিত পাকিস্তানে যোগ দেয়ার প্রশ্নে অনুষ্ঠিত সিলেট গণভোটে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। এই ভোটের ফলে আসাম থেকে সিলেট বিচ্ছিন্ন হয়ে পূর্ব বাংলায় যোগ দেয়।
১৯৫২ সালে তিনি নেজামে ইসলাম দলের সভাপতি নির্বাচিত হন। তিনি ১৯৫৪ সালে মাওলানা ভাসানী সোহরাওয়ার্দীর সাথে যুক্তভাবে যুক্তফ্রন্টের অঙ্গদল হিসেবে আন্দোলন পরিচালনা করেন। তারই নেতৃত্বে একই সনে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে নেজামে ইসলাম দল প্রাদেশিক পরিষদে ৪টি ও জাতীয় পরিষদে ৩৬টি আসন লাভ করে। প্রাদেশিক পরিষদের উক্ত ৪টি আসনের একটিতে তিনি প্রার্থী হিসেবে বিজয়ী হয়েছিলেন। ১৯৬৫ সালে আইয়ুব খানের সরকার তাকে গ্রেপ্তার করে। ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের পূর্বে তিনি মুক্তি পান। এরপর তিনি ওয়াজ নসিহতমূলক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে ইসলাম প্রচারে আত্মনিয়োগ করেন। এছাড়া তিনি ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনসহ জাতীয় প্রতিটি সংগ্রামে অংশ গ্রহণ করেন। তিনি ১৯৭১ সনের মুক্তিযুদ্ধে বিতর্কিত ভূমিকার কারণে তিন বছর কারাবরণ করেন। অনশেষে বাঙালি জাতির জনকের সাধারণ ক্ষমার ঘোষণায় জেল থেকে মুক্তি পান।

#শিক্ষাবিস্তার:
হযরত মাওলানা আতহার আলী( রহঃ) ১৯৪৫ সালে ‘আল জামেয়াতুল ইমদাদিয়া’ নামে একটি মাদ্রাসা স্থাপন করেন। পরবর্তীতে ময়মনসিংহের কিশোরগঞ্জে দারুল উলুম মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি বেকারত্ব দূরীকরণে মাদ্রাসায় কারিগরি শিক্ষার ব্যবস্থা করেন। তিনি সেই মাদ্রাসায় গ্রন্থাগার ও গবেষণা কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করেন। তাঁর প্রচেষ্টায় বিভিন্ন স্থানে বহু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সমাজকল্যাণমূলক প্রতিষ্ঠান হড়ে উঠে। তারই প্রচেষ্ঠায় ১৯৭৮ সনে “বি-ফাকুল মাদারিসিল কাওমিয়া আল-আরাবিয়া” নামে একটি কেন্দ্রীয় সংগঠন প্রতিষ্ঠা লাভ করে। তারপর বাংলাদেশের প্রায় তিনশ’র উপরে কওমি মাদ্রাসা এই কেন্দ্রীয় সংগঠনের অধীনে আসে। এছাড়াও তিনি নিজ গ্রাম ঘুঙ্গাদিয়ায় একটি দোতলা আধুনিক স্থাপত্যের সুদৃশ্য মসজিদ স্থাপন করেন।

#লেখালেখি_কর্ম:
হযরত মাওলানা আতহার আলী( রহঃ) লেখালেখি করতেন। তিনি কুরআন, হাদিস, উসূল্ফিকাহ, ফালসাফা ছাড়াও রাষ্ট্র, সমাজ, অর্থ ও বিচার সংশ্লিষ্ট বিষয়ের উপর জ্ঞান রাখতেন। তিনি মাসিক আল-মুনাদী, সাপ্তাহিক নেজামে ইসলাম, দৈনিক নাজাত পত্রপত্রিকার প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন। তাঁর প্রকাশিত বইয়ের মধ্যে রয়েছে-পর্দা ও ইসলাম, আল-ওজরু ওয়ান নুযরু, ইসলামী শাসন কেন চাই?, বাস্তব ক্ষেত্রে সমাজতন্ত্র, ইসলামে অর্থবন্টন ব্যবস্থা।

#স্বীকৃতি :
১৯৮৯ সনে ‘দাওয়াহ’ বিষয়ে অবদানের জন্য ইসলামিক ফাউণ্ডেশন, বাংলাদেশ তাঁকে ১৪০৭-১৪০৮ হিজরীর ফাউন্ডেশন পুরুস্কার প্রদান করে।

#মৃত্যু:
হযরত মাওলানা আতহার আলী( রহঃ) ছিলেন অতি কর্মঠ, আত্মসচেতন ও আত্মমর্যাদাশীল ব্যক্তি। চিন্তা-ভাবনায় ছিলেন বলিষ্ঠ মনের অধিকারী। তিনি ছিলেন ইসলামি গণজাগরণের ‘নকীব’। ১৯৭৬ সালের ৫ অক্টোবর ৮৩ বছর বয়সে ময়মনসিংহ মেডিকেল হাসপাতালে হযরত মাওলানা আতহার আলী( রহঃ) ইন্তেকাল করেন। তাঁরই হাতে গড়া ‘দারুল উলূম মাদ্রাসার পাশেই তাঁকে দাফন করা হয়েছে।

#লেখক: শিক্ষাবিদ ও কলামিস্ট। প্রধান শিক্ষক- দাসউরা উচ্চ বিদ্যালয়। সভাপতি – বিয়ানীবাজার প্রেসক্লাব।

#তথ্যসূত্র:
১. ইসলামী বিশ্বকোষ- ইসলামী ফাউণ্ডেশন, বাংলাদেশ।
২. মুজাহিদে মিল্লাত মাওলানা আতাহার আলী (রহঃ) -আতাউর রহমান খান।
৩. হাদীয়ে মিল্লাত আতহার আলী (রহঃ) -মুহাম্মদ আতীকুর রেজা।

রিপ্লাই করুন

অনুগ্রহ করে আপনার মন্তব্য লিখুন
অনুগ্রহ করে আপনার নাম লিখুন