নীড়পাতা সমকালীন সংবাদ বাংলাদেশ পঞ্চখণ্ডের_গুণী_ব্যক্তি হাজী ছইদ আলী (১৯০৮-১৯৮৯)

পঞ্চখণ্ডের_গুণী_ব্যক্তি হাজী ছইদ আলী (১৯০৮-১৯৮৯)

2
0

আতাউর রহমান

পঞ্চাশের দশকে অবিভক্ত ভারতবর্ষে ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের অন্যতম নেতা পঞ্চখণ্ডের এক আদর্শিক পুরুষ হাজী ছইদ আলী। তিনি ছিলেন সাহিত্যসেবী, সমাজ সংস্কারক, রাজনীতিবিদ ও ইঞ্জিনিয়ার।

#শৈশব :
শ্রীহট্ট জিলার পঞ্চখণ্ডের খাসাড়ীপাড়া গ্রামে এক মুসলিম কৃষাণ পরিবারে হাজী ছইদ আলী ১৯০৮ সনের মার্চ মাসে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম মোহাম্মদ আলী ও মাতার নাম রমিজা খাতুন। তাঁর বাবা কোন উচ্চশিক্ষিত লোক ছিলেন না। কিন্তু কর্মদক্ষতা, তীক্ষ্ণবুদ্ধির সহজাত গুণে তিনি গড়ে তুলেছিলেন সমৃদ্ধশালী এক পারিবারিক জীবন।

#শিক্ষাজীবন :
ছইদ আলী বাল্যশিক্ষা গ্রহণ করেন গ্রামের পাঠশালায় ও জলঢুপ এম.ই স্কুলে। সিলেট সরকারি হাইস্কুল থেকে মেট্রিক পাশ করে ভারতের যাদবপুর ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে ভর্তি হন। সেখান থেকে ১৯২৮ সনে ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারিং পাশ করেন।

#কর্মজীবন :
ছইদ আলী ১৯২৮ সনের শেষের দিকে পি.ডব্লিউ. ডি-এর সহকারী মোটর ভেইকল ইন্সপেক্টর পদে চাকুরীর মাধ্যমে কর্মজীবন শুরু করেন। চাকুরীর শৃঙ্খল জীবন তাঁর পছন্দ হয়নি। মাতৃভূমির পরাধীনতা ও মুক্তির আকাঙ্ক্ষা চেপে ধরায় চাকুরী তাঁর কাছে অর্থহীন মনে হল। তাই প্রায় তিন বছর চাকুরী করার পর ১৯৩১ সনে তিনি পদত্যাগ করেন। তিনি বাংলা, হিন্দি, উর্দু, ইংরেজী ও ফারসি ভাষায় দক্ষ ছিলেন।

#রাজনৈতিক_জীবন:
রাজনীতির হাতেখড়ি তাঁর ছাত্রাবস্থায় খেলাফত আন্দোলনের পুরুধা মৌলানা মোহাম্মদ আলীর সান্নিধ্যে পেয়ে। দেশ মাতৃকার দুর্দিনে দেশপ্রেমিক ছইদ আলী সাহসী সন্তানের ভূমিকা পালন করেছেন। ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে অবদান রাখতে গিয়ে ১৯৩১ সনে পুরো নয় মাস তাঁকে ব্রিটিশ সরকারের কারাগারে অন্তরীণ থাকতে হয়েছে। ১৯৩২ সনে করিমগঞ্জে এক সভা করার অপরাধে তিনি আবার জেলে যান। আড়াই বছর কারাবরণ শেষে জেল থেকে ছাড়া পান।
ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনে কৃষকদের জোরালো সংগঠনের প্রয়োজনে তিনি যোগ দেন ভারতীয় কৃষক সভায়। মেধা ও প্রজ্ঞার বদৌলতে ছইদ আলী ১৯৩৪ সনে আসাম প্রদেশ কৃষাণ সভার সহসভাপতি নির্বাচিত হন। তখন আবার ব্রিটিশ সরকারের চোখ পড়ে ছইদ আলীর উপর। তখন আত্মগোপনে থেকেও দেশের জন্য, মানুষের জন্য তিনি রাজনীতি করতেন। পুলিশের গ্রেফতারি পরোয়ানা ও গ্রেফতার এড়াতে ১৯৩৫ সনে ভারত থেকে আফগানিস্তান হয়ে ইরানে চলে যান। ১৯৩৭ সনে ইরান থেকে পায়ে হেঁটে পবিত্র মক্কা-মদিনা গমন করে হজ্জ্বব্রত পালন করেন। সেখান থেকে ফিরে আসেন পাঞ্জাবের সাহরানপুরে। ১৯৪০ সনের শেষদিকে তিনি জন্মভূমির উদ্দেশ্য রওয়ানা দেন। সাহরানপুর থেকে বাড়ী ফেরার খবর চলে যায় ব্রিটিশ বেনিয়ার স্থানীয় পুলিশ দপ্তরে। আবার গ্রেফতার হয়ে কারাবাসে যান। কিন্তু অখণ্ড ভারত সমর্থক ছইদ আলীকে তাঁর সংকল্প থেকে সরানো যায়নি। ১৯৪৭ সনে ভারত বিভক্ত হয়ে পড়লে তিনি রাজনীতি থেকে অনেকটা দূরে সরে যান। অবশেষে বাস্তবতা মেনে নিয়ে রয়ে যান অখণ্ড ভারতের পূর্ব পাকিস্তান নামক ভূখণ্ডে। মুসলিম লীগ সরকারের পাকিস্তান আমলে তিনি ছিলেন অনেকাংশে অবাঞ্ছিত। তাঁকে বারবার প্রতিপক্ষের কোপানলে পড়তে হয়েছে।

#স্বাধীনতা_সংগ্রামে:
ঊনসত্তরের গণ আন্দোলনের শেষে এলো মুক্তিযুদ্ধ। ১৯৭১ সনে ৬৩ বছর বয়সী ছইদ আলী বাংলাদেশের স্বাধীনতা উদ্ধারের আন্দোলনেও এগিয়ে এলেন। বার্ধক্য তাঁকে আটকাতে পারেনি। কংগ্রেস নেতার সুবাদে সীমান্ত অতিক্রম করে তিনিও চলে গেলেন ভারতে। সেখানে গিয়ে স্বাধীনতার জন্য অক্লান্তিক পরিশ্রম করে মুক্তিকামী যোদ্ধাদের মিছিলে যোগ দিলেন। দেশপ্রেমে উজ্জ্বীবিত এই মানুষটিকে চেনা ও বুঝা কঠিন ছিল। স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় ভারতের লোকসভার জনৈক সদস্য তাঁরই বন্ধু করিমগঞ্জে ইন্দিরা গান্ধীর সভায় ছইদ আলীকে নিয়ে গেলেন। সভা চলছে, বন্ধুর পাশে আরেক বন্ধু। আওয়ামীলীগের বড় বড় নেতারাও উপস্থিত। একের পর এক বক্তৃতা চলছে। কংগ্রেস বন্ধুটি হঠাৎ ধাক্কা মেরে বললো-“এই ছইদ” ওদের কথায় হবে না-রে। তুই কিছু বল। ইন্ধিরা গান্ধী তো চলে যাবে। বন্ধুর ধাক্কা খেয়ে ওঠে দাঁড়ালেন ছইদ আলী। সবাই তাকিয়ে দেখলো উসকো খুসকো লম্বা ওভার কোট পরিহিত হাজী ছাইদ আলীকে। কেউ তাকে ঠিকমতো চিনেন না। হিন্দি ভাষায় বক্তৃতা শুরু করলেন ছইদ আলী। সেদিনের বক্তৃতার মোদ্দা কথা হলো-” বিধ্বস্ত বাংলাদেশ থেকে আমরা এসেছি। ভারতের আশ্রয়ে আমরা আশ্রিত। কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করার ভাষা নেই। এই মুহুর্তে আমাদের চাওয়া শুধু একটাই তার নাম- ‘অস্ত্র’। সেই অস্ত্র হাতে নিয়ে আমরা শত্রুর মোকাবেলা করে দেশ রক্ষা করবো।” বক্তব্য শেষে ইন্দিরা গান্ধী জিজ্ঞেস করলেন, ওনার কী পরিচয়? লোকসভার সদস্য কংগ্রেস বন্ধু পরিচয় করিয়ে দিলেন হাজী ছাইদ আলীকে। তৎক্ষনাৎ ইন্দিরা গান্ধী কংগ্রেস নেতার পরিচয় পেয়ে সম্মানসূচক সমাদর করলেন হাজী ছাইদ আলীকে। যুদ্ধকালীন বাকী দিনগুলোও কংগ্রেস দলের যোদ্ধা বলে তাঁর মর্যাদার ত্রুটি হয়নি। দেশ স্বাধীন হবার পর ফিরে আসেন গ্রামের বাড়ীতে। কিন্তু দেশ স্বাধীন এলেও এই দেশপ্রেমিক লোকটার কোন মূল্যায়ন হলো না। কেউ খোঁজখবরও নিলো না।

#আদর্শিক_ছইদ_আলী
দারুণ অর্থকষ্টে জীবন অতিষ্ঠ হলেও নীতিবহির্ভূত, স্বার্থপরের মতো কোন কাজ তিনি জীবনে করেননি। তিনি অন্যায়ের কাছে মাথা নত করতে শিখেননি। অন্যায়কে ঘৃণার চোখে দেখতেন। সেজন্য স্বার্থান্বেষীরা তাঁকে ভালো চোখে দেখতো না। তিনি স্বাভাবিক পোশাকে চলাফেরা করতেন। বিয়ানীবাজার উপজেলার আলোকিত কৃতি সন্তানদের মধ্যে অন্যতম এক ব্যক্তি হাজী ছইদ আলী। তিনি কংগ্রেস রাজনীতির আদর্শে দীক্ষা নেয়া এক উজ্জীবিত লোক। তাঁর আদর্শিক মানুষরা হলেন- মৌলানা মোহাম্মদ আলী, চিত্তরঞ্জন দাস, মাওলানা আবুল কালাম আজাদ, করমচাঁদ গান্ধী, সরোজিনি নাইডো, নেতাজী সুভাষ বসু প্রমুখ।

#বাংলাদেশের_ছইদ_আলী :
১৯৪৭-এ পাকিস্তান হলো, ১৯৭১-এ বাংলাদেশ। তখনও হাজী ছাইদ আলীর কংগ্রেস ছেড়ে অন্যকিছুর প্রতি দুর্বলতা দেখাননি। তিনি আজীবন কংগ্রেস ছিলেন। দেশপ্রেম ও আদর্শের প্রতি ছিল তাঁর অগাধ বিশ্বাস। বাংলা, হিন্দি, উর্দু, ইংরেজী ও ফারসি ভাষায় তিনি কথা বলতে পারতেন। আশির দশকে কংগ্রেস আদর্শের হাজী ছইদ আলী দোয়াত-কলম মার্কা নিয়ে চেয়ারম্যান প্রার্থী হিসেবে বিয়ানীবাজার ইউনিয়ন পরিষদে নির্বাচন করলেন। তাঁকে নির্বাচন থেকে সরানোর প্রচেষ্টাও কম হয়নি। তিনি পরাজয় জেনেও নির্বাচন করলেন। কেন নির্বাচন করছেন? এমন প্রশ্নের উত্তরে বললেন, “আমি সৎ নিষ্ঠাবান মানুষদের আশীর্বাদ চাইতে নির্বাচনের প্রার্থী হয়েছি।” তিনি নির্বাচনে সফল হতে পারেন নি। হাতে গোনা কয়েকটি ভোটও পেলেন। তখনও ছইদ আলী বললেন, আমার কাংখিত বিজয় অর্জিত হয়েছে। কারণ, এখনো সত্যিকার মানুষ সমাজে বেঁচে আছে। এই ঘুণে ধরা সমাজ আদর্শবান মানুষদের মূল্যায়ন করতে চায় না। বিত্তশালী বলবানদের স্বার্থ রক্ষায় তারা সর্বদা তৎপর থাকে। তাই, আর নয়; গুণীজনের মূল্যায়ন প্রত্যাশা করা তো দোষের নয়।

দীর্ঘদেহী মৃত্যুঞ্জয়ী ছইদ আলী মানুষটাকে বয়সের শেষভাগে প্রায়ই দেখা যেতো বিয়ানীবাজারের নয়াগ্রাম রোডের বকুল হোটেলে। এখানে তাঁর আসা ছিল যেন দৈনিক রুটিন। দূর থেকে তাঁকে অনায়াসে চেনা যেতো।
তাঁর পরনে থাকতো জং ধরা ওভারকোট, মাথায় বাদামী রঙের গান্ধী টুপি, হাতের মুটোয় কাঠের শক্ত লাঠি, বগলে একগাদা পত্রিকা, লম্বা ধাচের সাদা রঙের দাড়ী। ছেলে-বুড়ো সবার সাথে অন্তরঙ্গ ভাব। হোটেলে চায়ের টেবিলে চলতো কবিতা আর গান। রাজনীতির ছইদ আলী শেষের দিকে কাব্যে মজেছিলেন। লিখতেন তিনি কাব্য কবিতা। তাঁর গান ছিল মরমী, তাত্ত্বিক, কবিতা ছিল সময়োপযোগী মাতৃপ্রেমের। অনেকে আগ্রহ ভরে শুনতো, আবার কেউ কেউ পাগলামিও বলতো। তাঁর লক্ষ্য ছিল- মানুষের কল্যাণ, সমাজ ব্যবস্থার উত্তরণ ও দেশের মুক্তি। কবি ছইদ আলী তাঁর কাব্য লক্ষ্মীতে দেশপ্রেম নিয়ে লিখলেন-
“সুদূর পথের যাত্রী মাগো
রাখিসনে আর আঁধার ঘর।
জ্বালিয়ে মাগো জ্ঞানের প্রদীপ
ছইদ-জীবন বিকাশ কর।”

#মৃত্যু :
এই প্রতিভাবান ছইদ আলী আবার জীবন সায়াহ্নে এসে তাঁর গীতি কবিতায় লিখলেন-
“ভবের খেলা হলো সাঙ্গ
না রইল ভবের ঠাঁই।
ওরে ও মাঝি ভাই-
আমারে লও পার করে
আমি পর পারে যাই।”

হাজী ছাইদ আলী ভবের খেলা সাঙ্গ করে ১৯৮৯ সনের ২৯ নভেম্বর ঠিকই পরপারে পাড়ি দিলেন। কিন্তু বেঁচে আছে তার আদর্শ। তিনি ছিলেন একজন বিচক্ষণ ও সরল প্রকৃতির মানুষ। তার বিদেহী আত্মার শান্তি কামনা করি।

#লেখক: শিক্ষাবিদ ও কলামিস্ট । প্রধান শিক্ষক, দাসউরা উচ্চ বিদ্যালয় ও সভাপতি- বিয়ানীবাজার প্রেসক্লাব।

রিপ্লাই করুন

অনুগ্রহ করে আপনার মন্তব্য লিখুন
অনুগ্রহ করে আপনার নাম লিখুন