নীড়পাতা শিল্প সাহিত্য পঞ্চখণ্ডের_গুণী_ব্যক্তি রায়বাহাদুর দুলাল চন্দ্র দেব (১৮৪১-১৯২১)

পঞ্চখণ্ডের_গুণী_ব্যক্তি রায়বাহাদুর দুলাল চন্দ্র দেব (১৮৪১-১৯২১)

2
0

আতাউর রহমান:

পঞ্চখণ্ডের রায়বাহাদুর দুলাল চন্দ্র দেব ছিলেন বিশিষ্ট রাজনীতিবিদ, সমাজসেবক ও শিক্ষাবিদ। যাঁর জীবন ও কর্ম জুড়ে আছে এক গৌরবময় আলোকবর্তিকা। তাঁকে অনুশীলন করা মানেই নিজেকে জাগ্রত করার সামিল।

#জন্ম:
দুলাল চন্দ্র দেব সিলেট জেলার বিয়ানীবাজার উপজেলার ঐতিহ্যবাহী লাউতা গ্রামে ১৮৪১ সনে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম বাবু মাধবচন্দ্র দেব।

#শিক্ষাজীবন :
দুলাল চন্দ্র দেব-এর শিক্ষাজীবন শুরু হয় নিজ গ্রামের পাঠশালায়। তাঁর বড় ভাই পেশকার সুবিদ কিশোর চন্দ্রের কর্মস্থল শিলচরে থাকায় তিনি শিলচর জেলা স্কুলে ভর্তি হন। সেখানে অধ্যয়নকালে মেধাবী দুলাল চন্দ্র দেব কাছাড়ের ডেপুটি কমিশনার মিঃ স্টুয়ার্টের দৃষ্টি আকৃষ্ট করতে সক্ষম হন। মিঃ স্টুয়ার্টের সহায়তায় শেষপর্যন্ত দুলাল চন্দ্র দেব সিলেটের প্রাইজ মিশন স্কুলে ভর্তি হয়ে ১৮৬৩ সনে মেট্রিক পাশ করেন। পাশাপাশি মিঃ স্টুয়ার্টের সহায়তায় মাসিক ২২টাকা করে সরকারী সাহায্য লাভ করেন। এরপর ঢাকা কলেজ থেকে তিনি এফ.এ এবং ১৮৬৯ সনে কলকাতা প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে বি.এ পাশ করেন। ১৮৭৫ সনে তিনি বি.এল ডিগ্রি লাভ করেন।

#কর্ম_জীবন :
দুলাল চন্দ্র দেব মেট্রিক পাশের পর ইংরেজি ভাষার দক্ষতা নিয়ে তিনি পার্টটাইম আদালতে বাংলা রেকর্ডপত্রের ইংরেজি অনুবাদের কাজ শুরু করেন। এরপর শিক্ষাজীবন শেষ হলে তিনি বারাসাত হাই স্কুলে শিক্ষকতা শুরু করেন। কিছুদিন পর সেখান থেকে ফিরে এসে আইনজীবী হিসেবে সিলেট জেলা বারে যোগদান করেন। ১৮৭৯ সনে তিনি সিলেট মিউনিসিপালিটিরর কমিশনার নিযুক্ত হন। ১৮৮৩ সনে নির্বাচন প্রথা প্রবর্তিত হলে তিনি পুনরায় কমিশনার নির্বাচিত হন। তখন পদাধিকার বলে জেলার ডেপুটি কমিশনারই ছিলেন অফিসিয়াল চেয়ারম্যান। ১৮৮৭ সানে তিনিই সর্বপ্রথম বেসরকারিভাবে চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন এবং দীর্ঘ আট বছর পৌরসভারর কার্য্যভার পরিচালনা করেন। এদিকে ১৮৮৩ থেকে ১৯১৪ সন পর্যন্ত তিনি সিলেটের সরকারি পিপি’র দায়িত্ব পালন করেন। শিক্ষার প্রসারে সিলেটের এমসি কলেজ প্রতিষ্ঠিত হলে বাবু দুলাল চন্দ্র দেব ১৮৯২ থেকে ১৯১২ সন পর্যন্ত তিনি ঐ কলেজের সেক্রেটারির দায়িত্ব পালন করেন। রাজা গিরিশ চন্দ্র কলেজটি পরিচালনার সম্পূর্ণ দায়িত্ব তখন তাঁর হাতে ন্যস্ত করলে কলেজটি টিকিয়ে রাখতে তিনি অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। ১৯০৭ সনে প্রদেশ গঠিত হলে, নবগঠিত আসাম প্রদেশের ব্যবস্থাপক সভার সদস্য নির্বাচিত হন বাবু দুলাল চন্দ্র দেব। তখন তিনি কেন্দ্রীয় টেক্সটবুক কমিটি ও মহিলা বিষয়ক কমিটির সদস্য মনোনীত হন। অবশেষে ১৯১৪ সনে তিনি সরকারি উকিলের পদ থেকে অবসর গ্রহন করেন।

#সমাজ_কর্ম :
আইন ব্যবসার পাশাপাশি দুলাল চন্দ্র দেব জনহিতকর কাজে অংশগ্রহণ করেন। ১৮৭৪ সনে সিলেটকে বঙ্গপ্রদেশ থেকে বিচ্ছিন্ন করে আসামের সাথে অন্তর্ভুক্তির প্রস্তাব দুলাল চন্দ্র দেব মনেপ্রাণে মেনে নিতে পারেন নি। তিনি জনতার কাতারে গিয়ে আন্দোলনের নেতৃত্ব দেন। দু’শ বছরের বৃটিশ শাসনকালে কোন গভর্ণর জেনারেল সিলেট না আসলেও এইবার আন্দোলনের তীব্রতায় বড়লাট নর্থব্রুক সিলেটের মানুষদেরকে আশ্বস্ত করতে আসেন। অবশেষে ১৯০৫ সনে বঙ্গভঙ্গ কার্যকর হয়। আসাম প্রদেশের ব্যবস্থাপক সভার সদস্য নির্বাচিত হওয়ার সুবাদে সিলেটের নিষ্কর জমির উপর সরকারী খাজনা ও স্থানীয় কর ধার্য্যের বিরোধিতা করেন। ফলে এসব প্রস্তাব নাকচ হয়ে যায়।
তিনি সারাজীবন ছাত্রাবস্থায় মিঃ স্টুয়ার্ট সাহেবের মমত্বের কথা ভুলতে পারেন নি। তাই তিনি জীবদ্দশায় অকুন্ঠিতভাবে ছাত্রদের সাহায্য করতেন। বিয়ানীবাজার তথা সিলেটের শতাধিক ব্যক্তি তাঁরই সহায়তায় উচ্চশিক্ষা নিয়ে সুপ্রতিষ্ঠিত হয়েছেন। রায়বাহাদুর দুলাল চন্দ্র দেব সিলেট পৌরসভার চেয়ারম্যান থাকাকালীন আসাম ভ্যালির কমিশনার (প্রশাসক) বিটসন বেল-এর সাথে তাঁর সু-সম্পর্ক গড়ে উঠে। রায়বাহাদুর দুলাল চন্দ্র দেবের সহযোগীতা নিয়ে বাবু পবিত্র নাথ দাস পিএইচজি হাই স্কুলের প্রথম স্বীকৃতি আদায় করেন। বাহাদুর দুলাল চন্দ্র দেবও নিজ উদ্যোগ ও অর্থায়নে জন্মভূমি লাউতায় একটি ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন। অবসর গ্রহণ পরবর্তী গ্রামে ফিরে আসেন।

#মৃত্যু :
রায়বাহাদুর দুলাল চন্দ্র দেব ছিলেন আদর্শ চরিত্রের অধিকারী এক জনদরদী। পঞ্চখণ্ডের গৌরবের ধন। তিনি ছিলেন বিশাল মনের মানুষ। এই গর্বের দীধিতি বিয়ানীবাজারের সন্তান দুলাল চন্দ্র দেব ১৯২১ সনে নিজ বাড়ীতে ইহধাম ত্যাগ করেন।

#লেখক: শিক্ষাবিদ ও কলামিস্ট। প্রধান শিক্ষক, দাসউরা উচ্চ বিদ্যালয় ও সভাপতি- বিয়ানীবাজার প্রেসক্লাব।

 

রিপ্লাই করুন

অনুগ্রহ করে আপনার মন্তব্য লিখুন
অনুগ্রহ করে আপনার নাম লিখুন