নীড়পাতা খেলাধুলা অন্যান্য পঞ্চখণ্ডের_ব্যক্তিত্ব : সমাজের এক বটবৃক্ষ হেড মাস্টার আলী আহমদ স্যার

পঞ্চখণ্ডের_ব্যক্তিত্ব : সমাজের এক বটবৃক্ষ হেড মাস্টার আলী আহমদ স্যার

33
0

আতাউর রহমান:

গেল ২০১৭ সনের ১৮ মার্চ শিক্ষক সমাজের পথ প্রদর্শক আলী আহমদ স্যারকে পঞ্চখণ্ড হরগোবিন্দ মডেল হাই স্কুলের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা বিদায় সংবর্ধনা দিলেন, সেখানে দর্শকের সারিতে আমিও(লেখক) ছিলাম। সেদিন দেখলাম স্যারের কর্মজীবনের শেষ উৎসবের বিরল আনুষ্ঠানিকতা। সে কথা আর বলতে চাই না। স্যার ছিলেন পঞ্চখণ্ড সমাজের এক বটবৃক্ষ শিক্ষক। স্যারের সাথে পরিচয় ১৯৭৬ সনে কুড়ার বাজার হাই স্কুলে ৬ষ্ঠ শ্রেণিতে ভর্তির সময়। সেই গড়ে উঠা সম্পর্ক ও প্রীতির বন্ধন আজও আছে। বিয়ানীবাজার অঞ্চলে শিক্ষার গুণগত মানোন্নয়নে আলী আহমদ স্যার ছিলেন অঙ্গীকারবদ্ধ। আমি যখন প্রথম শিক্ষকতায় যোগদান করি, সেই যোগদান বোর্ডে ভাইবা’র প্রশ্নকর্তা ছিলেন আমার শিক্ষাগুরু আলী আহমদ স্যার। সেদিন নিয়োগ বোর্ডের সবাইকে স্যার বললেন, “কোন প্রশ্ন করার প্রয়োজন নেই, সে থাকবে কিনা সেটি নিশ্চিত করুন”। এমন পরীক্ষা ক’জনার ভাগ্যে জুটে! আর যখন ‘প্রধান শিক্ষক’ হিসেবে যোগদান করলাম তখন স্যার ভীষণ খুশি হয়েছিলেন। আর পিঠে হাত রেখে বলেছিলেন, “অবশেষে নোঙর বন্দরে লেগেছে। মশাল জ্বালিও”। এমন একজন শিক্ষকের ছাত্র হিসেবে আমি খুবই গর্বিত। হে জ্ঞান তাপস, লেখার শুরুতে জানাই আপনাকে অকৃত্রিম শ্রদ্ধা ও অভিবাদন।

#জন্ম: শিক্ষক সমাজের বটবৃক্ষ আলী আহমদ স্যার ১৯৪৩ সনের ১ নভেম্বর বিয়ানীবাজার উপজেলার কসবা গ্রামের বড়বাড়ির এক শিক্ষিত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম মোঃ মদচ্ছির আলী ও মায়ের নাম শামছুন নেছা খানম। তাঁর পিতা ছিলেন স্কুল ইন্সপেক্টর ও মাতা ছিলেন সে যূগের মেট্রিক পাশ বিদূষী মহিলা।

#কর্মজীবন : শিক্ষাবিদ আলী আহমদ স্যার
আলোকিত মানুষ গড়ার নিপুণ এক কারিগর ও খ্যাতিমান এক হেডমাস্টার হিসেবে সর্বমহলে পরিচিত। স্যার ১৯৬৩ সনে সহকারী শিক্ষক পদে শিক্ষকতা শুরু করেন পিএইচজি হাই স্কুল থেকে। ১৯৬৪ সনের এপ্রিল মাসে তিনি কুড়ার বাজার জুনিয়র হাই স্কুলে হেডমাস্টার পদে যোগদান করেন। তাঁরই তত্ত্বাবধানে স্কুলটি জুনিয়র থেকে পূর্ণাঙ্গ হাই স্কুলে রূপান্তরিত হয়। সেখান থেকে ১৯৮০ সনে সময়ের প্রয়োজনে পুনরায় পিএইচজি স্কুলের হেডমাস্টার পদে আসীন হোন। দু’টি প্রতিষ্ঠানে সততা, দক্ষতা, ন্যায়নিষ্ঠ ও প্রতিষ্ঠানের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিষয়ে যত্নশীল থেকে প্রধান শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। শিক্ষক সমাজের দীপ্তমান ব্যক্তিত্ব আলী আহমদ স্যার শিক্ষকতাকে নিয়েছিলেন ব্রত, সাধনা, পেশা ও নেশা হিসেবে। তিনি ছিলেন নীতিতে অটল, প্রাতিষ্ঠানিক স্বার্থে কঠোর, বচনে স্বল্পভাষী এবং প্রশাসনে ইস্পাত কঠিন। তিনি একাধারে ৩৫ বছর শিক্ষকতা পেশায় নিয়োজিত থেকে একদিনও প্রাইভেট টিউশন করেননি।

#স্বীকৃতি :
তিনি সমাজের ছাত্র, শিক্ষক, অভিভাবক, সাহিত্যিক, সাংবাদিক, শিল্পী, সমাজসেবী, রাজনীতিবিদ, প্রশাসন সহ সকলের কাছে গ্রহনযোগ্য ব্যক্তিত্ব। চলনে বলনে স্যার অতি নম্র-ভদ্র স্বভাবের লোক। আর কর্মে ছিলেন বীর। এই কর্মবীর আলী আহমদ স্যার প্রধান শিক্ষক পদ থেকে অবসর পরবর্তী পিএইচজি মডেল উচ্চ বিদ্যালয়ের পরিচালনা কমিটির সভাপতি নির্বাচিত হোন। সততা ও বিনয়ীর উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত আলী আহমদ স্যার বাংলাদেশ শিক্ষক সমিতি সিলেট জেলা শাখার সিনিয়র সহ-সভাপতি, বিয়ানীবাজার উপজেলা শাখার সভাপতি ও সম্পাদক হিসেবে বেসরকারি শিক্ষকের অধিকার আদায়ের আন্দোলনে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। সিলেটের শিক্ষার হার বৃদ্ধির লক্ষে ঢাকাস্থ বিয়ানীবাজার জনকল্যাণ সমিতি ১৯৯৩ ও ১৯৯৪ সনে সিলেটে দুইটি শিক্ষা সেমিনারের আয়োজন করে। উভয় সেমিনারের আহবায়ক ছিলেন সমাজের বটবৃক্ষ হেড মাস্টার আলী আহমদ স্যার। তিনি ‘আকাদ্দাস সিরাজ রচনাবলী প্রকাশনা পরিষদেরও আহবায়ক ছিলেন। তিনি বিয়ানীবাজার উপজেলার শ্রেষ্ঠ মাধ্যমিক প্রধান শিক্ষককের স্বীকৃতি লাভ করেন। ২০০৪ সনে শিক্ষা সপ্তাহ উপলক্ষে সিলেট জেলার অন্যতম কৃতি শিক্ষক হিসেবে সম্মানিত হোন। এছাড়াও শিক্ষার আলো বিচ্চুরণে বিশেষ ভূমিকা রাখায় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও সংগঠন কর্তৃক তিনি পুরস্কৃত ও সম্মানিত হন।

#শেষকথা:
দরদী আলী আহমদ স্যার, আপনি অন্তরে অজয় আর কীর্তিতে মহান। আপনি ছিলেন, আছেন ও থাকবেন আমাদের মাঝে কর্মবীর, শিক্ষাগুরু, গুণী, অভিভাবক, জ্ঞান তাপস ও পথ প্রদর্শকরূপে। আমাদের হৃদয়ের এলবামে আপনি থাকবেন চির অম্লান। তাই তো কবি যথার্থই বলেছেন-
“সেই ধন্য নরকূলে, লোকে যারে নাহি ভুলে
মনের মন্দিরে সদা সেবে সর্বজন।”
পরিশেষে আপনার সুস্বাস্থ্য প্রার্থনা করি। মহান আল্লাহ আপনাকে দীর্ঘায়ু দান করুন। আমীন।

#লেখক : প্রধান শিক্ষক, দাসউরা উচ্চ বিদ্যালয় ও সভাপতি- বিয়ানীবাজার প্রেসক্লাব।

রিপ্লাই করুন

অনুগ্রহ করে আপনার মন্তব্য লিখুন
অনুগ্রহ করে আপনার নাম লিখুন