নীড়পাতা সকল বিভাগ উপসম্পাদকীয় বঙ্গবন্ধু আজও কোটি বাঙালির হৃদয়ের স্পন্দন

বঙ্গবন্ধু আজও কোটি বাঙালির হৃদয়ের স্পন্দন

104
0
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান

আমানুল্লাহ সরকার

ঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব আজ শুধু একটি নামে সীমাবদ্ধ নেই এই নাম আজ বাংলাদেশের ষোল কোটি বাঙালির হৃদস্পন্দন হয়ে স্ব-মহিমায় ভাস্বর। বাঙ্গালী জাতির বিভীষিকাময় কালো অধ্যায়ের অন্ধকার থেকে পুরো জাতিকে আলোকবর্তিকা দেখিয়েছিলেন বাঙালি জাতির জনক, বাংলার অহংকার, স্বাধীনতার ঘোষক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। বাংলাদেশ সৃষ্টি, বাংলা ভাষার স্বীকৃতি, বাঙ্গালি জাতি ও বাংলাদেশের স্বাধীনতা এই শব্দগুলি হয়তোবা ইতিহাসের পাতায় অন্ধকারের আলোয় লেখা থাকতো হতভাগা বাঙ্গালীদের স্বপ্ন হয়ে কিন্তু এক মহানায়কের আর্বিভাব ও নেতৃত্ব সব অন্ধকার ও হতাসাকে ধূলিষ্যৎ করে প্রতিষ্ঠিত করেছে লাল সবুজের আলো ঝলমলে এক উর্বর ভূমির যার নাম বাংলাদেশ। যার কারনেই আমরা আজ স্বাধীন বাংলাদেশের স্বাধীন নাগরিক। একটি শিশুর স্বাধীন ভাবে জন্মলাভ ও স্বাধীনভাবে বেড়ে ওঠার জন্য উর্বর স্বাধীন বাংলাদেশের রুপকার ছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মজিবুর রহমান।

শেখ মুজিব বাঙালি জাতির জন্য এমন একটি নাম যাকে নিয়ে লিখতে গেলে দিনের পর দিন শেষ হয়ে যাবে কিন্তু লেখা শেষ হবে না। চলুন আমরা  আজ এই মহান নেতা ও বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষক বঙ্গবন্ধু সম্পর্কে জেনে নেই আরো কিছু কথা।

জন্ম,শিক্ষা-দিক্ষা ও রাজনীতিতে যোগ দানঃ

১৭ই মার্চ, ১৯২০ সালে গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় শেখ লুৎফুর রহমান এবং সায়রা বেগমের ঘরে জন্ম নেন জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। ছয় ভাইবোনের মধ্যে তিনি ছিলেন তৃতীয়। গোপালগঞ্জ পাবলিক স্কুল ও কলকাতা ইসলামিয়া কলেজে পড়াশনা শেষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক পাশ করেন। ১৮ বছর বয়সে বেগম ফজিলাতুন্নেসার সাথে তাঁর বিয়ে হয়। তাদের ২ মেয়ে – শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা এবং তিন ছেলে- শেখ কামাল, শেখ জামাল ও শেখ রাসেল।

অল্পবয়স থেকেই তাঁর রাজনৈতিক প্রতিভার প্রকাশ ঘটতে থাকে। ১৯৪০ সালে তিনি নিখিল ভারত মুসলিম লীগের ছাত্র সংগঠন নিখিল ভারত মুসলিম ছাত্র ফেডারেশনে যোগ দেন। কট্টরপন্থী এই সংগঠন ছেড়ে ১৯৪৩ সালে যোগ দেন উদারপন্থী ও প্রগতিশীল সংগঠন বেঙ্গল মুসলিম লীগে। এখানেই সান্নিধ্যে আসেন হুসেইন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে থাকাকালীন সময়ে রক্ষণশীল কট্টরপন্থী নিখিল ভারত মুসলিম ছাত্র ফেডারেশনের কর্তৃত্ব খর্ব করতে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্র লীগ।

ভাষা আন্দোলনের সময় রাজনৈতিক নেতা হিসেবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন শেখ মুজিব। ১৯৪৮ সালে ভাষার প্রশ্নে তাঁর নেতৃত্বেই প্রথম প্রতিবাদ এবং ছাত্র ধর্মঘট শুরু হয় যা চূড়ান্ত রূপ নেয় ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারিতে।

মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণঃ

স্বৈরাচারী পাকিস্থানী শাষকদের সুদীর্ঘ তেইশ বছরের শোষন ও বঞ্চনার নাগপাশ ছিন্ন করে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ডাক দিয়েছিলেন বাঙ্গালী জাতির পথ প্রদর্শক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান। সেই দিন বঙ্গবন্ধুর ডাকে সাড়া দিয়ে জাতি, ধর্ম,বর্ণ নির্বিশেষে দেশরক্ষার সংগ্রামে পাকিস্থানী হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন পূর্ব বাংলার আপামর জনতা। ৭ই মার্চের সেই জ্বালাময়ী ভাষণ আজও উদ্দিপনা জগায় কোটি কোটি বাঙ্গালির অন্তরে। ঐতিহাসিক রেসকোর্স ময়দানে লাখো জনতার সামনে বর্জ কণ্ঠে বাঙ্গালী জাতির পিতা বলেছিলেন, “ভাইয়েরা আমার, আজ দুঃখ ভরাক্রান্ত মন নিয়ে আপনাদের সামনে হাজির হয়েছি। আপনারা সবাই জানেন আমরা আমাদের জীবন দিয়ে চেষ্টা করেছি, কিন্তু ঢাকা, চট্টগ্রাম, খুলনা, রংপুর, যশোরের রাজপথ আমার ভাইয়ের রক্তে রঞ্জিত হয়েছে। নির্বাচনে আপনারা ভোট দিয়ে আওয়ামীলীগকে জয়ী করেছিলেন শাসনতন্ত্র রচনার জন্য। আশা ছিল জাতীয় পরিষদ বসবে। আমরা শাসনতন্ত্র তৈরি করব এবং এই শাসনতন্ত্রে মানুষ তাদের অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, আর সাংস্কৃতিক মুক্তি লাভ করবে। কিন্তু ২৩ বছরের ইতিহাসে বাংলার মানুষের মুমূর্ষু আর্তনাদের ইতিহাস, নির্যাতিত মানুষের কান্নার ইতিহাস, রক্ত দানের করুন ইতিহাস।

৫২ সালে আমরা রক্ত দিয়েছি ৫৪ সালে নির্বাচনে জয়লাভ করে ও গদীতে বসতে পারিনি। ৫৮ সালে দেশে সামরিক শাসন জারি করে আইয়ুব খান দশ বছরে আমাদের গোলাম করে রাখলো, ৬৬ সালে ‘ছয় দফা’  রাখা হলো এবং এরপর এ অপরাধে আমরা বহু ভাইকে হত্যা করা হলো। ৬৯ সালে গণ আন্দোলনে আইয়ুবের পতনের পর ইয়াহিয়া খান এলেন। তিনি বললেন তিনি জনগনের হাতে ক্ষমতা ফিরিয়ে শাসনতন্ত্র দেবেন। আমরা মেনে নিলাম। তার পরের ঘটনা সকলেই জানেন। ইয়াইয়া খানের সঙ্গে আলোচনা হলো, আমরা তাকে ১৫ই ফেব্রুয়ারী জাতীয় পরিষদের  অধিবেশন ডাকার অনুরোধ করলাম। কিন্তু মেজরিটি পাটির নেতা হওয়া সত্ত্বে ও তিনি আমার কথা শুনলেন না। শুনলেন ভূট্টো সাহেবের কথা।

পেসিডেন্ট ইয়াহিয়াকে আমি আবার জানিয়ে দিতে চাই দেশকে একেবারে জাহান্নামে নিয়ে যাইবেন না। যদি আমরা শান্তি পূর্ণভাবে ফয়সালা করতে পারি, জানবেন যে, বাঁচার সম্ভাবনা আছে। এই জন্য অনুরোধ মিলিটারি শাসন চালাবার আর চেষ্টা করবেন না। রক্ত যখন দিয়েছি রক্ত আরো দেবো তবু এই দেশকে মুক্ত করে ছাড়বো ইনশাআল্লাহ। এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম আমাদের স্বাধীনতার সংগ্রাম”।

তাঁর এই ভাষণের পর সমগ্র জনতা ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন মহান মুক্তিযুদ্ধে । দীর্ঘ নয় মাস রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের লাখো শহীদের রক্তের বিনিময়ে বাংলাদশে অর্জন করে কাঙ্খিত সাফল্য মহান স্বাধীনতা। বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জন বিশ্বের ইতিহাসের বুকে অভূতপূর্ব এক ঘটনা। তাঁর কারণেই বাংলাদেশ আজ বিশ্বের ইতিহাসে স্বাধীন জাতি হিসেবে মাথা উঁচু করে দাড়িয়ে আছে।

১৫ই আগষ্ট বাঙ্গালির কলঙ্গ অধ্যায়ের সূচনা:

মহানায়কের কাজের প্রতিদান যে রক্ত দিয়ে লিখা হবে তা কে জানতো? বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যাকরে বাঙ্গালী জাতি যে কলঙ্কময় অধ্যায়ের সূচনা করেছে তা শেষ হবার নয়। তাঁর এই মৃত্যুতে হাজার বছর পিছিয়ে গেছে বাংলাদেশ।

১৯৭৫ সালের ১৫ আগষ্টের ভোর সোয়া পাঁচটার দিকে বঙ্গবন্ধুর ধানমন্ডির ৩২ নম্বর বাড়ি আক্রমন করে পাকিস্থানের পেআত্মা রুপী বিশ্বাসঘাতক, দালাল, রাজাকার, আলবদরের বংশধরা রাষ্ট্র ক্ষমতা দখল করার জন্য বাংলাদেশের স্থপতি বাঙ্গালীর জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সহপরিবারে হত্যা করে। এই হত্যা যে কতাটা নিষ্ঠুর, বরর্বর হয়েছিল তা হয়তবা হাড়ে টের পাচ্ছে হতভাগা বাঙ্গালী জাতি।  ঘাতক বাহিনী সেই রাতে পরিকল্পিত ভাবে ্ওই জঘন্যতম হত্যাকান্ড ঘটিয়েছিল, সেদিন ষ্টেনগানের গুলি বঙ্গবন্ধুর বুকের ডান দিকে একটা বিরাট ছিদ্র করে বেরিয়ে গেল। বাঙ্গালী জাতীয়তাবাদের মহান নেতার প্রাণহীন দেহ সিঁড়ির মাথায় পড়ে রইল। সময় তখন ভোর ৫টা ৪০ মিনিট। তার পর একে একে বঙ্গবন্ধুর পরিবারের সকল সদস্যকে হত্যা করে ঘাতকরা। এমনকি সেই দিন নরপিচাশদের হাত থেকে রক্ষা পায়নি রাসেলের মত ছোট্ট শিশুটিও। বঙ্গবন্ধু ও তাঁর পরিপারের সদস্যদের রক্তে রঞ্জিত হয় বাড়ির সিঁড়ি ও ফ্লোর এ যেন এক রক্তের সাগর। চারিদিকে পড়ে যায় শোকের ছায়া, রক্ত পূরীতে পরিণত হয় সমগ্র বাংলাদেশ। এ যেন রক্ত দিয়ে লেখা বাঙ্গালী জাতির চির কলঙ্কিত এক অধ্যায়।

জাতির শত্রুরা হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি, স্বাধীন বাংলাদেশের রূপকার এই মহান নেতাকে হত্যা করে যে ক্ষতি এদেশের জন্য করেছে তা কখনো পূরণ হবার নয়। জাতি আজও কলঙ্কিত, ধিক্কার ঐ সব নরপিচাশদেরকে যারা রাষ্ট্র ক্ষমতা দখলের জন্য আজও ষড়যন্ত্র করে যাচ্ছে। কবে সত্যিকারে পাকিস্থানী পেআত্মা মুক্ত হবে বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের বাংলাদেশ সে প্রত্যাশায় অপেক্ষামান পুরো বাঙালি জাতি…

লেখক: মো: আমানুল্লাহ সরকার , সাংবাদিক ও সিনিয়র কনটেন্ট রাইটার

 

রিপ্লাই করুন

অনুগ্রহ করে আপনার মন্তব্য লিখুন
অনুগ্রহ করে আপনার নাম লিখুন