নীড়পাতা খেলাধুলা বাংলাদেশ এক নম্বর দল হবে—এই স্বপ্ন নিয়ে বেঁচে আছি

বাংলাদেশ এক নম্বর দল হবে—এই স্বপ্ন নিয়ে বেঁচে আছি

4
0

সম্ভাবনা ডেস্ক:

একটা সময় ‘ক্রিকেট কোচ’ বললেই যাঁর ছবি ভেসে উঠত তিনি সৈয়দ আলতাফ হোসেন। সেই বিশাল পরিচয়ের ছায়ায় ঢাকা পড়ে আছে বলে অনেকে জানেনই না বাংলাদেশ থেকে পাকিস্তান টেস্ট স্কোয়াডে ডাক পাওয়া প্রথম খেলোয়াড়টি ছিলেন তিনি। এমন অনেক অজানা গল্পই নোমান মোহাম্মদ এবং কালের কণ্ঠ পাঠকদের শোনালেন এখন জীবনের শেষ প্রান্তে পৌঁছানো এই ক্রিকেট সেবক।

প্রশ্ন : প্রথম প্রশ্ন অনেক কিছুই হতে পারত; কিন্তু আপনাকে দেখার পর প্রথম প্রশ্ন হয় একটিই—কেমন আছেন?

সৈয়দ আলতাফ হোসেন : আমি কানে খুব একটা শুনি না। প্রশ্নগুলো জোরে চিৎকার করে করতে হবে।

প্রশ্ন : (চিৎকার করে) কোনো অসুবিধা নেই। বলুন তো আপনার শরীর এখন কেমন?

আলতাফ হোসেন : আমি ভালো নেই। একেবারেই ভালো নেই। বিভিন্ন রোগে ভুগছি। এসবের শুরু ২০০৯ সালে। তখন আমি আক্রান্ত হই মেনিনজাইটিসে। কোমায় ছিলাম ২৪ ঘণ্টা। বেঁচে ফিরেছি, কিন্তু শরীরের নানা অংশ খারাপ হয়ে গেল। নষ্ট হয়ে গেল কান দুটি।

ডাক্তারকে বললাম। উনি বললেন, ‘আল্লাহর কাছে শোকর করেন। যার মেনিনজাইটিস হয়, সে বাঁচে না। বাঁচলেও বধির ও পঙ্গু হয়ে থাকে। আপনার ঝড়ঝাপটা শুধু কানের ওপর দিয়ে গেছে। ’ আমি তাই আল্লাহর কাছে শোকর করি। বিছানায় তো আর পড়ে নেই।

প্রশ্ন : বাইরে কি যেতে পারেন?

আলতাফ হোসেন : সাহস করে একা একা যাই না। রাস্তায় পা দিলে মনে হয়, এক পা এদিকে চলে যাচ্ছে, আরেক পা অন্য দিকে। গাড়ি দেখলে ভয় লাগে, একপাশে দাঁড়িয়ে থাকি। বাইরে বেরোলে তাই কাউকে সঙ্গে নিয়ে যাই। দূরে কোথাও তো আর যাই না। আমার বড় মেয়ে থাকে বেগমবাজার। সেখানে রিকশায় করে যাই, রিকশায় করে আসি। আমার শরীরের এই ভালো, এই খারাপ অবস্থা। হাত-পা কাঁপে। সপ্তাহখানেক ধরে মাথায় আবার কী যেন সমস্যা দেখা দিয়েছে। ঘুম হয় না, চোখ লেগে এলেই শাঁ করে মাথা যেন উঠে যায়। ডাক্তার ওষুধ দিয়েছে। এখন মাথার অবস্থা একটু ভালোর দিকে। তবে আমি দিনে ঘুমাই না। কারণ আমার সারা জীবনের অভ্যাস সারা দিন মাঠে থাকা।

প্রশ্ন : এখন যে আর মাঠে থাকতে পারেন না, এ জন্য নিশ্চয়ই কষ্ট হয় খুব?

আলতাফ হোসেন : খুব খারাপ লাগে। ঘরের মধ্যে হাঁটতে থাকি খালি। কত বড় বড় মাঠে দৌড়েছি! এখন এই ছোট্ট ঘরে হাঁটলে কি মন ভরে? বরং কষ্ট আরো বেড়ে যায়। তবে আবার আনন্দও আছে। যখনই বাংলাদেশ দলের খেলা টিভিতে দেখায়, আমি সব বাদ দিয়ে খেলা দেখি। কী যে ভালো লাগে! কত যে আনন্দ হয়!

প্রশ্ন : সারা জীবন যে খেলাটির সঙ্গে কাটালেন, সেই ক্রিকেটের লোকজন আপনার খোঁজখবর নেন? দেখতে আসেন?

আলতাফ হোসেন : আগে সবাই আসত। মানু, ফারুক, ওয়াসিম হায়দার, আলতাফ রানা, ওসমান, জালাল আহমেদ। ক্রিকেট বোর্ড থেকে লিপু, জালাল ইউনুসরা এসে দেখা করে গেছে। তবে বছরখানেক ধরে সেভাবে আর কেউ আসে না। তবে ক্রিকেট কোচ ওসমান ও জালাল মাসখানেক আগে এসেছিল। আমার তো কানে সমস্যা। আর বেশিক্ষণ কথা বলতে কষ্টও হয়। আমার স্ত্রীর সঙ্গে ওরা বেশি কথা বলল। এখন আমার স্ত্রী বাসায় নেই। ছেলেটাও অফিসে। থাকলে ওদের কাছ থেকে আরো অনেক কিছু জানতে পারতেন। যা-ই হোক, ওসমান আর জালালের কথা বলছিলাম। এসব পুরনো দিনের লোকজনের সঙ্গে দেখা হলে আমার বড় ভালো লাগে।

প্রশ্ন : পুরনো দিনের কথা ভাবতে কেমন লাগে? মাঠের কথা? ক্রিকেটের কথা?

আলতাফ হোসেন : ভালো লাগে। ওসব কথা সব সময় মনে হয়। টিভিতে খেলা দেখলেই আমার মাথার মধ্যে চক্কর দেয়। মনে হয়, মাঠে আমি এটা করেছি। বল এভাবে করতাম। আবার কোচিং করাতাম এভাবে। ঢাকা স্টেডিয়াম, বিকেএসপি, বিভিন্ন জেলা, দেশের বাইরে বিভিন্ন দেশের স্টেডিয়াম—সব মাথায় চক্কর দিতে থাকে। অবশ্য এখন বয়স হয়ে গেছে। ৭৮ বছর চলছে। স্মৃতিগুলো তাই কেমন যেন ঝাপসা হয়ে আসছে।

প্রশ্ন : তবু যদি একটু পুরনো দিনের কথা মনে করতেন! ক্রিকেট খেলাটি কেন শুরু করেছিলেন, মনে আছে?

আলতাফ হোসেন : আমার জন্ম ১৯৩৮ সালে, হুগলিতে। পরে যখন দেশ ভাগ হলো, পুরো পরিবার চলে আসি এই বাংলায়। ছোটবেলায় ফুটবল-ক্রিকেট-বাস্কেটবল সবই কিন্তু খেলতাম। ফুটবলে তৃতীয় বিভাগের শান্তিনগর ক্লাবে খেলেছি পর্যন্ত। তবে বেশি ভালো লাগল ক্রিকেট। খেলতে খেলতেই হয়ে গেল নেশা।

প্রশ্ন : ফাস্ট বোলার হলেন কেন?

আলতাফ হোসেন : ছোটবেলা থেকেই আমি অনেক লম্বা। সবাই বলত, ক্রিকেট খেললে ফাস্ট বোলার হয়ে যা। আমিও দেখলাম, জোরে বল করতে পারি। জোরে বল করলে ভালো লাগে। হয়ে গেলাম ফাস্ট বোলার। পরে তো লম্বা হতে হতে ছয় ফুট এক ইঞ্চি। তবে বোলিংয়ের পাশাপাশি আমি মিডল-অর্ডারে ভালো ব্যাটিংও করতাম। খেলতাম সোজা সোজা।

প্রশ্ন : বাউন্সার দিয়ে কোনো ব্যাটসম্যানকে ফেলে দেওয়ার ঘটনা রয়েছে?

আলতাফ হোসেন : বল মাথায় লাগত না। বুকে-পেটে লাগত। একবার আমার বলে ব্যাটসম্যানের গার্ড ভেঙে যাওয়ার ঘটনা আছে। রক্ত বের হয়ে গিয়েছিল। আমি খেলি পিডাব্লিউডিতে। আর ব্যাটসম্যানটি ছিল চৌধুরী; ওয়ারী ক্লাবের।

প্রশ্ন : এই যে ক্রিকেট খেলতেন, বাবা-মা কিছু বলতেন না?

আলতাফ হোসেন : না। কারণ পড়ার সময় পড়াশোনা করতাম। স্কুল তো ফাঁকি দিতাম না। নিউ গভর্নমেন্ট হাই স্কুলে আমার পড়াশোনা। পরে পড়েছি কায়েদে আজম কলেজে, এখন যেটি সোহরাওয়ার্দী কলেজ। পড়ার সময় পড়তাম। আর বাকি সময়টা খেলতাম।

প্রশ্ন : ক্লাব ক্রিকেটে খেলেছেন কোন কোন দলে?

আলতাফ হোসেন : সর্বপ্রথম খেলি কায়েদে আজম ক্লাবে, ১৯৫৪ সালে। এরপর ওয়ান্ডারার্স, পিডাব্লিডি, ইপি জিমখানায়। যুদ্ধের আগে এ কয়টি ক্লাবেই খেলেছি। এর মধ্যে জাতীয় আম্পায়ার হয়ে গেলাম ১৯৭০ সালে। পরিচালনা করেছি পাকিস্তানের প্রথম শ্রেণির ম্যাচ। তবে ক্রিকেট আমি খেলেছি কোচ হওয়ার পরও। টুকটাক খেলে গেছি একেবারে ১৯৮২ সাল পর্যন্ত। আর সেই পাকিস্তান আমলে খেলেছি অনেক বড় বড় ক্রিকেটারের সঙ্গে। হানিফ মোহাম্মদের মতো কিংবদন্তি ছিলেন আমার অধিনায়ক। বহু বছর পর ১৯৮৬ সালে বাংলাদেশ জাতীয় দলের কোচ হয়ে পাকিস্তান যাই। সেখানে দেখা হানিফের সঙ্গে। ও এসে আমাকে একেবারে বুকে জড়িয়ে ধরল। বলল, ‘আলতাফ তো আমাদেরই মানুষ। ’

প্রশ্ন : ক্লাব ক্রিকেটে খেলে পারিশ্রমিক পেতেন কেমন?

আলতাফ হোসেন : আমরা নিজের খেয়ে খেলতাম। কেউ একটা পয়সা দিত না। শুধু দুপুরের লাঞ্চে একটি পরোটা ও একটু মাংস খাইয়ে দিত, ব্যস! এখন তো শুধু টাকা আর টাকা। মাঝেমধ্যে চিন্তা করি, আমার যা ফর্ম ছিল, তাতে এই সময়ে খেললে নিশ্চয়ই কোটিপতি হয়ে যেতাম (হাসি)।

প্রশ্ন : কিছু স্মরণীয় ম্যাচের কথা বলুন, যেগুলোর পারফরম্যান্সের কথা মনে হলে এখনো ভালো লাগে।

আলতাফ হোসেন : স্মরণীয় ম্যাচের কথা আর কী বলব! ঢাকায় আইয়ুব ট্রফির একটি ম্যাচের কথা মনে পড়ছে। ডিআইটির এক নম্বর মাঠে হয়েছিল খেলাটি। আমি ছিলাম পূর্ব পাকিস্তান দলে। পিআইএর বিপক্ষে ওই খেলায় ২২ রানে সাত উইকেট নিয়েছিলাম। আরেকটি খেলার কথা বলি। জিমখানার পক্ষে পিডাব্লিউডির বিপক্ষে সেঞ্চুরি করেছিলাম। ১২১ রানে অপরাজিত। এই দুটি ম্যাচের বাইরে অন্য কিছু তেমন মনে নেই। তবে আগের দিনের লোকদের কাছে জিজ্ঞেস করলে জানবেন আমার পারফরম্যান্স। বোলিং করতে নামলে তিন-চার উইকেট করে পেতাম। ব্যাটিংয়ে সেঞ্চুরি তেমন না থাকলেও পঞ্চাশ আছে অনেক।

প্রশ্ন : আপনি কি ব্যাটসম্যান ভালো ছিলেন নাকি বোলার?

আলতাফ হোসেন : আগে বোলার, পরে ব্যাটসম্যান। আর শেষে অলরাউন্ডার। আমাদের সময়কার আরেক ফাস্ট বোলার মরহুম দৌলত-উজ-জামান সবাইকে বলতেন, ‘এনার বল খেলতে সবার মাথা ঘোরে। কারণ এক অ্যাকশনে কোনো বল ইনসুইং করে, কোনোটি আউটসুইং। কিভাবে খেলবে, সেটি নিয়ে সব সময় চিন্তা থাকে। আর যেসব বল পেটে বা গায়ে লাগে, একেবারে নীল হয়ে যায়। ’

প্রশ্ন : যেসব ব্যাটসম্যানকে বোলিং করেছেন, সবচেয়ে কঠিন লেগেছে কাকে?

আলতাফ হোসেন : সাঈদ আহমেদ। ওয়ান ডাউনে নামত।

প্রশ্ন : কোচ পরিচয় ছাপিয়ে গেছে আপনার খেলোয়াড়ি পরিচয়কে। কিন্তু আপনিই তো তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের প্রথম ক্রিকেটার হিসেবে পাকিস্তান জাতীয় দলের টেস্ট স্কোয়াডে ডাক পেয়েছিলেন। সেই ঘটনাটি যদি একটু বলতেন?

আলতাফ হোসেন : সেটি ১৯৬৫ সাল। নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে সিরিজ। আমাকে ওরা স্কোয়াডে নিল ঠিকই; কিন্তু খেলায়নি। দলের সঙ্গে ঘুরিয়ে দেশে পাঠিয়ে দিল। আমাকে না খেলিয়ে ওদের নিজেদের মানুষ খেলাল। টিম করে হাতে দিয়ে দেয়—আর বলে, তুমি বসে থাকো। আমি তো আর কিছু বলতে পারি না। কারণ আমার হাতে কিছু নেই, সব কিছু ওদের হাতে। আমাকে খেলতে দেয়নি বলে খুব কষ্ট পেয়েছি। আবার এটিও সত্য, পাকিস্তান জাতীয় দলে সুযোগ পাওয়া কঠিন ব্যাপার ছিল। আর আমরা যারা পূর্ব পাকিস্তানে ছিলাম, তাদের জন্য আরো কঠিন। আমাকে এখানকার প্রথম খেলোয়াড় হিসেবে টেস্ট স্কোয়াডে ডাকায় তাই খুশি হয়েছিলাম খুব। কিন্তু ওরা যে আমাকে খেলাল না, সেই দুঃখ এখনো রয়েছে।

প্রশ্ন : পরে আর ডাকেনি?

আলতাফ হোসেন : নাহ্। ওই একবারই।

প্রশ্ন : এবার আপনার কোচিং-জীবনে একটু আসতে চাই। খেলোয়াড়ি জীবনে কি ভেবেছিলেন কোচ হবেন?

আলতাফ হোসেন : কখনো না। আমি খেলতে খেলতে হয়ে গেলাম আম্পায়ার। এরপর কোচ হওয়াটা হঠাৎ করে। মোজাফফর হোসেন পল্টু তখন ঢাকা সিটি আওয়ামী লীগের জেনারেল সেক্রেটারি। আমরা বন্ধু, দুজন দুজনকে ‘তুই’ করে বলি। ১৯৭৪ সালে পল্টু এসে একদিন বলল, ‘তুই পাতিয়ালায় যা। ওখানে থেকে কোচিং ট্রেনিং নিয়ে এসে বাংলাদেশের জাতীয় কোচ হয়ে যা। ’ কিন্তু আমি তো পাতিয়ালা চিনি না। যাব কি যাব না—এ নিয়ে একটু দ্বিধায় ছিলাম। পল্টু সাহস দিয়ে বলল, ‘তোর কোনো চিন্তা নেই। সব ব্যবস্থা আমি করব। ’ তখনই হঠাৎ আমি জানতে পারলাম যে আমি ক্রিকেট কোচ হব।

প্রশ্ন : পাতিয়ালার ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব স্পোর্টস (এনআইএস) থেকে এই ডিপ্লোমা নিয়ে আসা বাংলাদেশের প্রথম ক্রিকেট কোচ তো আপনিই?

আলতাফ হোসেন : হ্যাঁ। সকাল ৭টা থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত কোচিং। সকালে ফিল্ডিং আর বোলিং অনুশীলন। দুপুরে ক্লাস। বিকেলে হয় ব্যাটিং প্র্যাকটিস। খুব কঠিন কোর্স। কিন্তু ক্রিকেট তো, আমার ভালোই লাগত। পাতিয়ালা থেকে ডিগ্রি নিয়ে আসার পর বাংলাদেশ জাতীয় ক্রীড়া পরিষদে আমার চাকরি হয়ে যায়। ২০০৬ সালে অবসরে যাওয়া পর্যন্ত ছিলাম সেখানে। এর মধ্যে ১৯৯৯ সালে পাই জাতীয় ক্রীড়া পুরস্কার। এখন পর্যন্ত বাংলাদেশের একমাত্র ক্রিকেট কোচ হিসেবে আমি এই পুরস্কার পেয়েছি। এটি যে কত গর্বের, বলে বোঝানোর মতো না। মৃত্যু পর্যন্ত মনে থাকবে।

প্রশ্ন : ১৯৭৯ সালে আরেকটি কোচিং কোর্স করেছিলেন ইংল্যান্ডে?

আলতাফ হোসেন : লর্ডসে। সেটি ছিল অ্যাডভান্সড কোর্স। অনেক কিছু শিখিয়েছিল। আমি যখন ওই কোচিং করছি, ঠিক তখনই বাংলাদেশ দল আইসিসি খেলার জন্য যায় ইংল্যান্ডে।

প্রশ্ন : ওই সময়টায় কখনো কি ভেবেছিলেন, বাংলাদেশের ক্রিকেট একদিন বর্তমান পর্যায়ে আসবে? টেস্ট স্টেটাস পাবে, ওয়ানডেতে সব দলকে হারাবে?

আলতাফ হোসেন : আমি সব সময় এই আশা করেছি। বাংলাদেশ টেস্ট খেলবে, বিশ্বকাপ খেলবে—এই স্বপ্ন আমার ছিল। কারণ আমাদের দলগুলো ছিল খুব ভালো। ওরা পারেনি বলে দুঃখ পেয়েছি। কিন্তু আগের দলগুলো পারেনি, এখন পারছে। এটাই তো আনন্দ। আমি আনন্দে দিশাহারা হয়ে যাই। আর যখন মনে হয়, ক্রিকেটের এই জায়গায় আসার পেছনে আমার কিছু অবদান রয়েছে—তখন গর্বে বুক ফুলে যায়। সর্বদা আমি এই চিন্তা করি। ভালো লাগে। আর বাংলাদেশ ক্রিকেট দল এক নম্বর হবে—এই আশায় এখনো বেঁচে আছি।

প্রশ্ন : জাতীয় দলের কোচ ছিলেন কোন সময়টায়?

আলতাফ হোসেন : তখন তো ক্রিকেট বোর্ডের আলাদা কোচ ছিল না। আমরা যারা জাতীয় ক্রীড়া পরিষদে ছিলাম, তাদেরই ডাকত বোর্ড। ডেপুটেশনে আমরা কাজ করতাম। সে হিসেবে ১৯৭৬ সাল থেকে শুরু করে ২০০১ পর্যন্ত—এই ২৫ বছরে প্রায় সবগুলো জাতীয় দলের সঙ্গেই কোনো না কোনোভাবে ছিলাম। ১৯৮৬ সালে কোচ হয়ে পাকিস্তান যাওয়ার কথা আগেই বলেছি। ১৯৯০ সালের এশিয়া কাপেও ডেপুটি ম্যানেজার কাম কোচ ছিলাম। ‘এ’ দলের কোচ ছিলাম অনেকবার। বয়সভিত্তিক অনেকগুলো দলেরও।

প্রশ্ন : আরেকটি ‘প্রথম’-এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে আপনার নাম। বাংলাদেশের প্রথম জাতীয় মহিলা দলেরও কোচ আপনি…

আলতাফ হোসেন : হ্যাঁ, ১৯৮৩ সালে। ইডেন গার্ডেনসে আমাদের মেয়েরা যায় খেলতে। আমাকে ডেকে বলা হলো দলটি তৈরি করে দিতে। আমি ওদের কিছুটা করে ব্যাটিং-বোলিং শেখালাম। শিখিয়ে নিয়ে যাই পশ্চিমবঙ্গে। সেখানে ইডেন গার্ডেনসে খেলা আসলে বিশাল ব্যাপার। আমরা সবাই ইতিহাসের অংশ হয়ে গেলাম।

প্রশ্ন : ক্লাব ক্রিকেটে কোন কোন দলের কোচ ছিলেন?

আলতাফ হোসেন : বড় একটা সময় ধরে বিমানের কোচ। এ ছাড়া সূর্যতরুণ, ধানমণ্ডি, সিটি ক্লাবসহ আরো অনেক ক্লাবেরই কোচ ছিলাম।

প্রশ্ন : আপনার অধীনে তো কয়েক প্রজন্মের ক্রিকেটার খেলেছেন। কাদের প্রথম দেখেই মনে হয়েছিল, ওরা খুব ভালো?

আলতাফ হোসেন : বাবা, আমার বয়স হয়ে গেছে। এত নামধাম আর মনে নেই। শুধু মনে আছে, যে ছেলেরা উদার মনে খেলে, তারা উন্নতি করে। কিন্তু যারা ভয় পায়, কী হবে না হবে ভাবে—তারা চলে না। যাদের কোচিং করিয়েছি, এখনো ওদের সঙ্গে দেখা হলে আমাকে বুকে লাগিয়ে নেয়। আকরাম খান, এনামুল হক মনি, আতহার আলী, বুলবুল, নান্নু, হাবিবুল বাশার, পাইলট—এরা সবাই বুকে জড়িয়ে ফেলে।

প্রশ্ন : শুনেছি, ঢাকার ক্রিকেটে আপনিই প্রথম ফিল্ডিংয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া কোচ। এই ভাবনা এলো কোত্থেকে?

আলতাফ হোসেন : ফিল্ডিং তো করতেই হবে। কারণ ফিল্ডিংয়ের ওপর সব কিছু নির্ভর করে। মাঠে বোলিং আর কতক্ষণ? ব্যাটিংয়ে এক বল খেলেই আউট হতে পারেন। কিন্তু ফিল্ডিংয়ে সবচেয়ে বেশি সময় মাঠে থাকতে হয়। সেটি তাই উপভোগ করতেই হবে। আর লর্ডসে গিয়ে আমি যে কোচিং কোর্স করেছি, সেখানে দেখেছি ফিল্ডিংয়ের খুব গুরুত্ব। আমিও তাই ছেলেদের অনেক বেশি ফিল্ডিং করাতাম। এই তো, এনামুল হক মনি সবার সামনে বলল, ‘আলতাফ ভাই আমাদের যে ফিল্ডিং প্র্যাকটিস করিয়েছেন, সেটি কোনো দিন ভুলব না। উনি আমাদের একেবারে তৈরি করে দিয়েছেন। ’ এসব কথা শুনলে ভালো লাগে।

প্রশ্ন : আপনার হাই-ক্যাচ প্র্যাকটিসের গল্প এখনো শোনা যায় পুরনো দিনের লোকদের কাছে…

আলতাফ হোসেন : আমি অনেক লম্বা তো। আর বলও মারতাম জোরে, অনেক ওপরে। বল ওপরে উঠতে উঠতে, ছোট হতে হতে একেবারে পিংপং বলের সাইজ হয়ে যেত। সেই ক্যাচ ধরা প্র্যাকটিস করাতাম। এরপর কাভার ক্যাচ, স্লিপের ক্যাচ। ফিল্ডিংয়ে সত্যি খুব জোর দিয়েছি। যে কারণে সবার শরীর একেবারে ফ্লেক্সিবল হয়ে গিয়েছিল।

প্রশ্ন : আপনার সমসাময়িক কোচদের মধ্যে ওসমান খান ছিলেন খুব কড়া। জালাল আহমেদ চৌধুরী আবার তেমন নন। আপনার ধাত ছিল কেমন?

আলতাফ হোসেন : আমি? নরমের সঙ্গে নরম। গরমের সঙ্গে গরম। যে কথা মানে, গুড। যে কথা মানে না, তাকেই শাস্তি। ভুল করলেই শাস্তি। একটি ক্যাচ মিস করলে দশ বুকডন। দুটি মিস করলে ২০টা। কাঁধে তো সে জন্য শক্তি লাগে। ভয়ে তাই কেউ ক্যাচ মিস করত না। এখন যে আম্পায়ারিং করছে সৈকত, ও একবার বুয়েট মাঠে ক্যাম্পে দেরি করে এসেছিল। আমি ওকে বসিয়ে দিই, প্র্যাকটিস করতে দিইনি। পরে এসে মাফ চেয়েছে। আর কোনো দিন দেরি করেনি। আর আমি ছিলাম ব্যাটিং কোচ, বোলিং কোচ, ফিল্ডিং কোচ, উইকেটকিপিং কোচ—সবই। এখন তো একেকটির জন্য একেক কোচ।

প্রশ্ন : কোচ হিসেবে স্মরণীয় কিছু অধ্যায় কি মনে করতে পারেন?

আলতাফ হোসেন : আমার কাছে সবচেয়ে স্মরণীয় এতগুলো ক্রিকেটার তৈরি করতে পারা। সে জন্য আজও তারা আমাকে স্মরণ করে। ফোন করে। দেখা হলে বুকে টেনে নেয়। আমার এক ছাত্র এখন আমেরিকায় থাকে। ও দুই-তিন মাস আগে ঢাকায় এসে আমার সঙ্গে দেখা করে গেছে। এগুলোর চেয়ে বড় প্রাপ্তি আর কী!

প্রশ্ন : কোচিং শেষ করিয়েছেন কবে?

আলতাফ হোসেন : ২৫ বছর চাকরি করে জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ থেকে অবসরে যাই ২০০১ সালে। এর পরও ২০০৬ পর্যন্ত কোচিং করিয়েছি। আর শরীরে কুলালো না। কোচিং তাই ছেড়ে দিতে হলো।

প্রশ্ন : অবসর নেওয়ার পর কি ক্রিকেট বোর্ড আর কাজের জন্য ডেকেছিল?

আলতাফ হোসেন : না। এমনিতে বোর্ডের অধীনে অনেক কাজ করেছি। জাতীয় দল নিয়ে, মহিলা দল, ‘এ’ দল, বয়সভিত্তিক দল। এ ছাড়া বোর্ড আমাকে কাজ দিয়ে সারা দেশে পাঠাত। ঘুরে ঘুরে নতুন নতুন ছেলেদের কোচিং করাতাম। কিন্তু এনএসসি থেকে আমি অবসর নেওয়ার পর বোর্ড আর আমাকে ডাকেনি। আমার কিন্তু কাজ করতে খুব ইচ্ছে হতো। ডাকেনি, তাই কী করব! ওই সময় মহিলা ক্রীড়া কমপ্লেক্সে মেয়েদের কোচিং করাতাম।

প্রশ্ন : খেলা দেখতে সর্বশেষ স্টেডিয়ামে গিয়েছেন কবে?

আলতাফ হোসেন : ক্রিকেট বোর্ড এই একটি কাজ করছে এখনো। খেলা হলেই আমার জন্য টিকিট পাঠায়। কিন্তু আমার শরীর খারাপ। সেভাবে আর যেতে পারি না। তবে গত বছর জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে একটি ম্যাচে গিয়েছিলাম। ছিলাম অল্প কিছু সময়।

প্রশ্ন : এবার যদি একটু সংসারের কথা বলতেন? বিয়ে করেছেন কবে?

আলতাফ হোসেন : বিয়ের তো হাফ সেঞ্চুরি হয়ে গেল। ১৯৬৫ সালের ৫ ডিসেম্বর বিয়ে করেছি; কার্ড আছে এখনো। আমার এক ছেলে, দুই মেয়ে। বিয়ের পর বড় মেয়ে থাকে বেগমবাজার, ছোট মেয়ে সাভার। আর এই সাতরওজায় আমার সঙ্গে থাকে ছেলে, ছেলের বউ, নাতি-নাতনি। ছেলে আমেরিকান এমবাসিতে চাকরি করে।

প্রশ্ন : এত এত ছেলেকে ক্রিকেটার বানালেন। নিজের ছেলে ক্রিকেটার হোক—এই ইচ্ছা হয়নি?

আলতাফ হোসেন : ও ক্রিকেট খেলেছে তো। ঢাকায় দ্বিতীয় বিভাগ পর্যন্ত খেলেছে। কিন্তু নিজের জীবনে দেখেছি, ক্রিকেট খেলে জীবনে খুব নিশ্চিন্ত থাকা যায় না। আর ছেলেও পরে চাকরি পেয়ে গেল। এই ফার্ম, ওই ফার্ম করতে করতে সরে গেল ক্রিকেট থেকে।

প্রশ্ন : জাতীয় ক্রীড়া পুরস্কার পাওয়ার গর্বের কথা তো বললেন। আপনার ঘরভর্তি দেখছি আরো অনেক পুরস্কারের ছবি, স্মারক…

আলতাফ হোসেন : সবগুলো যত্ন করে রেখে দিয়েছি। আমার সন্তান, তার সন্তান, তারও সন্তান যেন দেখতে পারে। জানতে পারে আমার কথা। আমাকে এনএসসি থেকে যেদিন বলল জাতীয় ক্রীড়া পুরস্কার পাওয়ার কথা—আমি ‘আচমকা’ হয়ে গেলাম। এই বড় সম্মান তো সোজা ব্যাপার নয়। কে পায় জাতীয় ক্রীড়া পুরস্কার, বলুন! খুব আনন্দ পেয়েছি। আবার যেমন ১৯৮৫ সালে বাংলাদেশ ক্রীড়া লেখক সমিতি আমাকে দেয় ‘বেস্ট ক্রিকেট কোচ’ পুরস্কার। ২০১২ সালে গ্রামীণফোন-প্রথম আলো দেয় আজীবন সম্মাননা। এ ছাড়া ক্লেমন স্পোর্টস ডেভেলপমেন্ট প্রোগ্রাম, উইকএন্ড ক্রিকেট ক্লাব অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ, বাংলাদেশ ক্রিকেট আম্পায়ার্স অ্যান্ড স্কোরার্স অ্যাসোসিয়েশনের কাছ থেকে পেয়েছি আজীবন সম্মাননা। সর্বশেষ কিছুদিন আগে ক্রীড়া লেখক সমিতি দিল ‘অগ্রজ সম্মাননা’। সব রেখে দিয়েছি।

প্রশ্ন : এবার শেষ প্রশ্নটি করি। সব মিলিয়ে ক্যারিয়ার নিয়ে, জীবন নিয়ে আপনার তৃপ্তি কতটা?

আলতাফ হোসেন : অনেক তৃপ্তি। ক্রিকেট থেকে এত যে সম্মান পাব, আমি চিন্তা করতে পারিনি। জীবনে হয়তো অনেক কিছু পাইনি। কিন্তু ক্রিকেটার কিংবা ক্রিকেট কোচ না হলে জীবনটা আরো ভালো হতো—এই চিন্তা কখনো করি না। সব মিলিয়ে আমি সুখী মানুষ। আল্লাহর কাছে সে জন্য শোকর করি।

প্রশ্ন : আপনার তো এখন ৭৮ বছর চলছে। আমরা চাই, আপনি জীবনের মাঠে সেঞ্চুরি করবেন। ভালো থাকবেন।

আলতাফ হোসেন : সেঞ্চুরির জন্য তো আরো অনেক বছর বাঁচতে হবে। তত দিন বাঁচি কি না কে জানে! তবে সবাইকে বলবেন, আমার জন্য দোয়া করতে।

সূত্রঃ কালের কণ্ঠ।

রিপ্লাই করুন

অনুগ্রহ করে আপনার মন্তব্য লিখুন
অনুগ্রহ করে আপনার নাম লিখুন