নীড়পাতা বাংলাদেশ সিলেট বিয়ানীবাজারের গুণী ব্যক্তি #মহেশ্বর_ন্যায়ালঙ্কার (১৫৮২- মৃত:)

বিয়ানীবাজারের গুণী ব্যক্তি #মহেশ্বর_ন্যায়ালঙ্কার (১৫৮২- মৃত:)

1
0

আতাউর রহমান:

পঞ্চখণ্ডের বরপুত্র মহেশ্বর ন্যায়ালঙ্কার। ষোড়শ শতকের বিখ্যাত পণ্ডিত। ক্ষুদে নবদ্বীপ’র সুপ্রসিদ্ধ নৈয়ায়িক সিলেটের গৌরবের বিশ্লেষণ করতে গিয়ে চারশ’ বছর আগে যে শ্লোকটি তিনি উচ্চারণ করেছিলেন, তা প্রবাদবাক্য রূপে আজও পরিগণিত হয়ে আসছে-
“সর্বত্র ত্রিবিধা লোকা উত্তমাধম মধ্যমা
শ্রীহট্টে মধ্যমো নাস্তি চট্টলে নাস্তি চোত্তম:”।

#জন্ম:
মহেশ্বর ন্যায়ালঙ্কার ১৫৮২ সনে সিলেট জেলার বিয়ানীবাজারের সুপাতলা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা ছিলেন মুকুন্দ রাম বিশারদ।

[ N.B. সুপাতলার কৃষ্ণাত্রেয় গোত্রীয়গণ ত্রিপুরাধিপতির যজ্ঞেস কৃষ্ণাত্রেয় গোত্রীয় শ্ৰীপতি আচার্যের আগমন হয়, পরবর্তী কালে এই বংশে উমাকান্ত চক্রবত্তীর জন্ম হয়, তাহার পুত্রের নাম রূপেশ্বর, তৎপুত্র মুকুন্দ রাম বিশারদ, তাহার পুত্রের নাম মহেশ্বর ন্যায়ালঙ্কার। মহেশ্বর হইতে এ বংশ বিশেষ গৌরবান্বিত হইয়াছে।-১ ]

মহেশ্বর ন্যায়শাস্ত্র অধ্যয়নের জন্য নবদ্বীপ গমন করেন এবং ন্যায়শাস্ত্রে বিশেষ পারদর্শিতা অর্জন করেন। তিনি সুপ্রসিদ্ধ নৈয়ায়িক জগদীশ তর্কালঙ্কারের ছাত্র ছিলেন। তাঁর নিকট শিক্ষা সমাপ্ত করে তিনি নবদ্বীপে একটি টোল প্রতিষ্ঠা করেন।

পঞ্চখণ্ড তথা শ্রীহট্টের গৌরব স্বরূপ মহেশ্বর এক বিখ্যাত সংস্কৃত গ্রন্থকার। তিনি কাব্য প্রকাশের “ভাবাৰ্থ চিন্তামনি” নামক অপূৰ্ব্ব টীকা প্রণয়ন পূৰ্ব্বক অক্ষয় কীৰ্ত্তি স্থাপন করিয়াছেন। এই টীকা কলিকাতাস্থ সংস্কৃত কলেজ এবং বঙ্গের অন্যান্য সংস্কৃত বিদ্যালয় সমূহে অধীত হইয়া থাকে। তৎপ্রণীত “স্মৃতি ব্যবস্থা” ও দায় ভাগের টীকা সংস্কৃত গ্রন্থ-ভাণ্ডারের অমূল্য রত্ন বিশেষ। স্মাৰ্ত্ত রঘুনন্দনের অষ্টাবিংশতি স্মৃতিতত্ত্বের প্রতি কটাক্ষ করিয়া, তাহারই ন্যায় তিনি অষ্টাবিংশতি “প্রদীপ” প্রণয়ন করেন। এছাড়াও তিনি স্মৃতি সম্বন্ধীয় আরো ২৮ খানি প্রদীপ গ্রন্থ রচনা করেন। এগুলো হচ্ছে :— সিদ্ধান্ত প্রদীপ , কালপ্রদীপ, আহ্নিক প্রদীপ, দেশ প্রদীপ, দায় প্রদীপ, অশৌচ প্রদীপ, উদ্বাহু প্রদীপ, তিথি প্রদীপ, প্রায়শ্চিত্ত প্রদীপ, জ্যোতীষ প্রদীপ, মলমাস প্রদীপ, তীর্থ প্রদীপ, দ্বৈত প্রদীপ, প্রতিষ্ঠা প্রদীপ, পরীক্ষা প্রদীপ, বিচার প্রদীপ, তন্ত্র প্রদীপ, সংস্কার প্রদীপ, দুর্গোৎসব প্রদীপ, বর্ণ প্রদীপ, একাদশী প্রদীপ, জ্ঞান প্রদীপ, শ্রাদ্ধ প্রদীপ, দোলযাত্রা প্রদীপ, ব্রত প্রদীপ, অধিকার প্রদীপ।

নবদ্বীপের এক সভায় জন্মমাটির বন্দনা করে মহেশ্বর ন্যায়ালঙ্কার তাঁর ‘দেশ প্রদীপ’ গ্রন্থে লিখেছিলেন-

“যত্র শ্রী বাসুদেবো জলনিধিতনয়া সারদা সর্বদাহত্র।
যত্রাস্তে পঞ্চখণ্ডে সতত বুধ সভা পালদত্তৌ ক্ষিতীশৌ।।
বাসস্থানং সুরম্য ফলমিতি সুরসাং বেষ্টিতং ত্বিক্ষুনদ্যা।
তদ্রাজ্যং স্বর্গতুল্যং ত্রিভুবনবিদিতং তত্র সন্ত্যোষ স্নত:।।”–[দেশ প্রদীপ]

আরো কিংবদন্তী আছে যে, কোন সময়ে মহেশ্বর ন্যায়ালঙ্কার মহাশয় ন্যায়শাস্ত্রের বিচারে নবদ্বীপের পণ্ডিত-সমাজকে সাত সাতবার পরাজিত করিয়াছিলেন। ইহার পর ইনি নবদ্বীপে চতুষ্পাঠী স্থাপন করিয়া নানা দেশীয় বহু ছাত্রকে অধ্যাপনা করান।

মহেশ্বর ন্যায়ালঙ্কার কবে দেহত্যাগ করে এ জগত থেকে বিদায় নিয়েছেন, তা অজানা হলেও সুপাতলা গ্রামে (শ্রীনাথ ভট্টাচার্য ও শৈলেন্দ্র ভট্টাচার্য-এর বাড়ী) তাঁর স্মৃতিস্তম্ভ বিদ্যমান আছে।

#লেখক: শিক্ষাবিদ ও কলামিস্ট। প্রধান শিক্ষক- দাসউরা উচ্চ বিদ্যালয়। সভাপতি – বিয়ানীবাজার প্রেসক্লাব।

#তথ্যসূত্র :
১. শ্রীহট্টের ইতিবৃত্ত তৃতীয় ভাগ-দ্বিতীয় খণ্ড: অচ্যুতচরণ চৌধুরী তত্ত্বনিধি। পৃষ্ঠা ১৩১।
২. পূর্ব সিলেটের ইতিহাস(১ম খণ্ড-পঞ্চখণ্ড অঞ্চল): পঞ্চখণ্ডের ক’জন পণ্ডিত- বিরাজ কান্তি দেব। জানুয়ারি ১৯৯২।
৩. সাহিত্য ও সাংবাদিকতায় বিয়ানীবাজার : শাওন প্রভা। বিয়ানীবাজার পরিক্রমা(১ম সংখ্যা) ১৯৯২।
৪. ফটো ক্রেডিট: একচ্যাঞ্জ৪.মিডিয়া-আসাম।

রিপ্লাই করুন

অনুগ্রহ করে আপনার মন্তব্য লিখুন
অনুগ্রহ করে আপনার নাম লিখুন