নীড়পাতা বাংলাদেশ সিলেট বিয়ানীবাজারের গুণী ব্যক্তি #মোহাম্মদ_আব্দুল_মুছওয়ীর_লোদী | #আলীগড়ী | (১৯১৪-১৯৭৬)

বিয়ানীবাজারের গুণী ব্যক্তি #মোহাম্মদ_আব্দুল_মুছওয়ীর_লোদী | #আলীগড়ী | (১৯১৪-১৯৭৬)

1
0

আতাউর রহমান

সিলেট অঞ্চলের তৎকালীন করিমগঞ্জ মহকুমার ঐতিহ্যবাহী বৃহত্তর মাথিউরা গ্রামের আধুনিক রূপকার ছিলেন মোহাম্মদ আব্দুল মুছওয়ীর লোদী। এলাকার লোকজন তাঁকে ‘আলীগড়ী’ নামেই চিনতেন। একজন সমাজ সংস্কারক, শিক্ষানুরাগী ব্যক্তিত্ব ‘আলীগড়ী’ খাদ্য বিভাগের মহাপরিচালক ছিলেন। অতীত যারা ভুলে না, তাদের কাছে তাঁর প্রজ্ঞা ও অবদান আজও স্মরণীয় হয়ে আছে।

#শৈশব:
মোহাম্মদ আব্দুল মুছওয়ীর লোদী ১৯১০ সনের ৩১ ডিসেম্বর সিলেট জেলার বিয়ানীবাজারের মাথিউরা ইউনিয়নের ঐতিহ্যবাহী পূর্বপার মহল্লার এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতার নাম মোঃ কনাই মিয়া এবং মাতার নাম আমিনা বেগম। তিনি ছিলেন বাবা-মা’র তৃতীয় সন্তান।

#শিক্ষাজীবন:
মেধাবী মোহাম্মদ আব্দুল মুছওয়ীর লোদী’র পড়াশোনা শুরু হয় গ্রামের মক্তবে। এরপর ভর্তি হন পঞ্চখণ্ড হরগোবিন্দ হাই স্কুলে। সেখান থেকে ১৯২৯ সনে ম্যাট্রিক পাশ করেন। এরপর তিনি উচ্চ শিক্ষার উদ্দেশ্যে আলীগড়ে পাড়ি দেন। আলীগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয় হতে ১৯৩১ সনে কৃতিত্বের সাথে ইন্টারমিডিয়েট পাশ ও একই প্রতিষ্ঠান থেকে ১৯৩৩ সনে স্নাতক ডিগ্রী অর্জন করেন। তিনিই ছিলেন বিয়ানীবাজারের প্রথম আলীগড় বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্র‍্যাজুয়েট। তাই তিনি ‘আলীগড়ী’ নামে সমাধিক পরিচিত ছিলেন। পরে তিনি ১৯৪৩ সনে শিলাচরে অবস্থিত ‘সেন্ট এণ্ডমাণ্ডস কলেজ’ হতে বি. টি. পাশ করেন।

#কর্মজীবন:
আব্দুল মুছওয়ীর লোদী কর্মজীবনের শুরুতে রেলওয়ে বিভাগে চাকুরীতে যোগ দেন। ছাত্রাবস্থায় শিক্ষক হবার নেশায় পড়ে সে চাকুরি করা হয়নি। তাই তিনি রেলওয়ে বিভাগের চাকুরি ছেড়ে পঞ্চখণ্ড হরগোবিন্দ হাই স্কুলে শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন। এ প্রতিষ্ঠান ছাড়াও তিনি সুনামগঞ্জ জেলা স্কুল ও শিলচর হাই স্কুলে শিক্ষক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। তাঁর শিক্ষকতা জীবনের শিষ্যদের মধ্যে পরবর্তীতে যারা প্রতিষ্ঠা লাভ করেছেন তারা হলেন- অধ্যক্ষ মাওলানা আব্দুল আজিজ (ইংরেজিতে গোল্ড মেডেলিস্ট), অবসরপ্রাপ্ত জজ আব্দুল আহাদ, জজ মুহিবুল হক, এডভোকেট আব্দুর রহিম এম.পি, কথা সাহিত্যিক আকাদ্দস সিরাজুল ইসলাম, অধ্যাপক রফিকুর রহমান প্রমুখ। আবদুল মুছওয়ীর লোদী কিছুদিন স্কুল ইন্সপেক্টর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এ দায়িত্ব নিয়ে তিনি বিয়ানীবাজারের বিভিন্ন বাড়িতে নারী শিক্ষার জন্য স্কুল প্রতিষ্ঠা শুরু করেন। এ সময় তিনি পিতামহের নামে “মুহাম্মদ আশরাফিয়া বালিকা বিদ্যালয়” প্রতিষ্ঠা করেন। এছাড়া তিনি মাথিউরা দুধবক্সীর আর্জদ আলীর বাড়িতে একটি, মাথিউরা পশ্চিম পাড়ের আকমল আলীর বাড়িতে একটি এবং মুল্লাগ্রামের আব্দুল মুকিত মাস্টারের বাড়িতে একটি করে বালিকা বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন।
১৯৪৫ সনে খাদ্য বিভাগে ইন্সপেক্টর হিসেবে যোগ দেন। এ সময় কাছাড়ে ভয়াবহ বন্যা দেখা দিলে তিনি ত্রাণ কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তীতে ধাপে ধাপে পদোন্নতি নিয়ে ১৯৬৬ সনে সততা ও নিষ্ঠার সহিত বাংলাদেশ(পূর্ব পাকিস্তান) খাদ্য বিভাগের মহাপরিচালক হন। ১৯৭০ সনে এই পদ থেকে তিনি অবসর গ্রহণ করেন।

#ব্যক্তিগত_জীবন:
আব্দুল মুছওয়ীর লোদী ছিলেন একজন আদর্শবান ব্যক্তি। তিনি মাথিউরা গ্রামের প্রথম মুসলিম গ্র‍্যাজুয়েট সন্তান। তিনি ছিলেন বিয়ানীবাজারের গুণী মহলের অন্যতম এক প্রতিকৃৎ। ১৯৪৪ সনে আব্দুল মুছওয়ীর লোদী তাঁর স্ত্রী বেগম নেহার-কে নিয়ে দাম্পত্যজীবন শুরু করেন। তিনি ছিলেন তিন পুত্র ও দুই কন্যা সন্তানের জনক। তারা সকলেই উচ্চ শিক্ষিত। বর্তমানে তারা দেশ-বিদেশে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে স্ব স্ব কর্মক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত। লোদী ছিলেন আপন মহিমায় সমুজ্জ্বল এক কীর্তিমান পুরুষ। তিনি সারাটি জীবন উৎসর্গ করে গেছেন মানবের কল্যাণে।

#সমাজ_কর্ম:
আব্দুল মুছওয়ীর লোদী’র পূর্বপুরুষেরা এলাকার উন্নয়নে ছিলেন নিবেদিত। তাঁর ধনাঢ্য পিতা ব্রিটিশ আমলে নিজ বাড়িতে এলাকার একমাত্র বিদ্যাপীঠ এম. ই. (মিডল ইংলিশ) মাদ্রাসার (১৯১৬-১৯৫৫) প্রতিষ্ঠা করেন; যা বর্তমানে সরকারি অর্থায়নে ‘মাথিউরা দারুল উলুম সিনিয়র মাদ্রাসা’ নামে জ্যোতি ছড়াচ্ছে। তাঁর পূর্বপুরুষদের জমির উপর মাথিউরা বাজার, কেন্দ্র মাথিউরা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা লাভ করে। উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত গুণের বশবর্তী হয়ে আলীগড়ী লোদী ছাত্রাবস্থা থেকে আমৃত্যু এলাকার উন্নতি নিয়ে ভাবতেন। তিনি বিশ্বাস করতেন, কল্যাণ সাধনে “কথায় না বড় হয়ে কাজে বড় হবে”। তাই তাঁর ধ্যান-জ্ঞান ও স্বপ্নে ছিল মাথিউরা গ্রামের উন্নয়ন ভাবনা। তখনকার দিনে তাঁরই প্রচেষ্টায় মাথিউরা-বিয়ানীবাজার সড়ক, মাথিউরা ডাকঘর, মাথিউরা উচ্চ-বিদ্যালয়, মাথিউরা এম.ই. মাদ্রাসা, এম.ই. স্কুল প্রতিষ্ঠা লাভ করে। তিনি ছিলেন এসব প্রতিষ্ঠানের স্বপ্নদ্রষ্টা, অন্যতম উদ্যোক্তা ও প্রতিষ্ঠাতা। এ জন্য তাঁকে বলা হয়ে থাকে মাথিউরা গ্রামের আধুনিক রূপকার।
এছাড়াও কুড়াখাল খনন, পঞ্চখণ্ড বিদ্যালয়ে মুসলিম শিক্ষক নিয়োগে বৈষম্য দূরীকরণ, রাজনীতি ও দুর্নীতি বিরোধী কর্মকাণ্ডে তাঁর অভূতপূর্ব ভূমিকা ছিল।

#মৃত্যু:
সুশীল সমাজ বিনির্মাণে যাঁরা আজীবন নিজেদের সমর্পণ করেন তাঁরা কখনো স্বীকৃতি চান না। তাদেরই অন্যতম একজন মোহাম্মদ আব্দুল মুছওয়ীর লোদী। আসলেই প্রকৃত সমাজসেবীরা স্বীকৃতি পাওয়ার আশায় সমাজসেবা করে না। এমন এক কর্মবীর মোহাম্মদ আব্দুল মুছওয়ীর ১৯৭৬ সালের ২২ জানুয়ারি হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে ঢাকাস্থ আজিমপুরের বাসায় মৃত্যুবরণ করেন। তাঁকে ঢাকার বনানী গোরস্থানে সমাহিত করা হয়। তাঁর কীর্তি-ই তাঁকে চিরকাল অমর করে রাখবে।

#লেখক: শিক্ষাবিদ ও কলামিস্ট। প্রধান শিক্ষক- দাসউরা উচ্চ বিদ্যালয়। সভাপতি – বিয়ানীবাজার প্রেসক্লাব।

#তথ্যসূত্র :
মোহাম্মদ আব্দুল মুছওয়ীর লোদী স্মারকগ্রন্থ : খালেদ জাফরী কর্তৃক সম্পাদিত ও মুহাম্মদ এনামুল মুনিম শামীম লোদী কর্তৃক প্রকাশিত। নভেম্বর-১৯৯৯।

রিপ্লাই করুন

অনুগ্রহ করে আপনার মন্তব্য লিখুন
অনুগ্রহ করে আপনার নাম লিখুন