নীড়পাতা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি ভাইরাল সংক্রমনে ভয় নয়,নিজের শক্তি জেনে রাখুন-জাহাঙ্গীর আলম তরফদার

ভাইরাল সংক্রমনে ভয় নয়,নিজের শক্তি জেনে রাখুন-জাহাঙ্গীর আলম তরফদার

ভাইরাল সংক্রমনে ভয় নয়, নিজের শক্তি জেনে রাখুন।
জাহাঙ্গীর আলম তরফদার

মানবদেহ বিভিন্নরকম জীবাণু বা অগণিত ফরেন পার্টিক্যালস্ এর দ্বারা পরিবেষ্টিত থাকে। এসব জীবাণু বা অনুপ্রবেশকারী অনুজীবের আক্রমণ থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য দেহের ভিতরে ও বাইরে একটি সুন্দর জটিল ব্যবস্থা ইনস্টল করা আছে। এটি প্রকৃতিগত ভাবে দেহের ভিতর ও বাইরে সর্বদা কর্মক্ষম থাকে। এ ব্যবস্থাপনাকে দেহের প্রতিরক্ষা বা ইমিউনিটি বলে।
তিন স্তরের বলয় নিয়ে এ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা। এ ব্যবস্থা প্রথম,দ্বিতীয় এবং তৃতীয় স্তরে সজ্জিত। যথা:
প্রথম স্তরের প্রতিরক্ষা-
এ সমরের সৈনিক হলো ত্বক,লোম,অশ্রু, লালা, সিরুমেন, পরিপাকনালী এবং জননতন্ত্রের অ্যাসিড। এসব অঙ্গাণু সমূহের ভৌত গঠন ও বিদ্যমান রাসায়নিক শক্তির দ্বারা একধরনের প্রতিবন্ধকতা তৈরি হয় যা প্রথম স্তরেই জীবাণুকে থামিয়ে দিতে পারে। যেমন, মানবদেহের ত্বক অভেদ্য, বায়ুরোধী এবং অনেকটাই ওয়াটারপ্রুফ। ত্বকে বিদ্যমান ঘাম গ্রন্থি নিসৃত ঘাম জীবাণুর জন্য প্রতিবন্ধকতা তৈরী করে। ডার্মিসাইডিন (ত্বকে থাকে) এ কাজে সহায়তা করে। নাকের লোমগুলো ছাঁকন এর কাজ করে। কানে বিদ্যমান হলুদ- বাদামী রঙের সিরুমেনে অনেক জীবাণু আটকে থাকে। চোখের সিক্ত অংশ এবং অশ্রু, জীবাণুনাশকের কাজ করে। লালা রসে বিদ্যমান এনজাইম সমূহ জীবাণু ধ্বংস করে।
দ্বিতীয় স্তরের প্রতিরক্ষা-
প্রথম স্তরের প্রতিরক্ষা ফাঁকি দিয়ে বা পরাজিত করে কোন জীবাণু দেহের অভ্যন্তরে প্রবেশ করলে শুরু হয় দ্বিতীয় স্তরের যুদ্ধ। এ যুদ্ধে রক্ত নামক তরল পদার্থ ও তার সৈনিক সমূহ সক্রিয় ভূমিকা পালন করে। তিন ধরনের রক্ত কণিকা,প্লাজমা ও অন্যান্য সৈন্যদলের সেনাপতি হলো শ্বেত রক্ত কণিকা (WBC)। শ্বেত রক্ত কণিকা কে বলা হয় দেহের অতন্দ্র প্রহরী। এতে বিদ্যমান নিউট্রোফিল, ম্যাক্রোফায্ বহিরাগত জীবাণু কে ভক্ষণ করে। একটি ম্যাক্রোফায্ ১০০টি অনুজীব ভক্ষণ করতে পারে। মানব দেহে এরকম অজস্র শ্বেত রক্ত কণিকা রয়েছে। এসব রক্ত কণিকার ও রয়েছে জীবনের চক্র।
এ স্তরে এন. কে (NK) নামক কোষ রয়েছে। এরা দেহে অনুপ্রবেশকারী জীবানুকে চিনতে পারে এবং ধ্বংস করে। এদেরকে ন্যাচরাল কিলার কোষ বলে। এ স্তরের আরেক কমান্ডার হলো ইন্টারফেরন। ভাইরাল আক্রমনের প্রতিক্রিয়া হিসেবে আক্রান্ত কোষে যে প্রতিরোধ গড়ে উঠে তাকে ইন্টারফেরন বলে। ইন্টারফেরন আক্রান্ত কোষে ভাইরাসের সংখ্যা বৃদ্ধিতে বাধা প্রদান করে। এক্ষেত্রে এন. কে কোষ তাকে সহায়তা করে, রসদ যোগায়।
প্রথম ও দ্বিতীয় স্তরের একটি বিষয় হলো এই দুই স্তরের যোদ্ধারা অনুপ্রবেশকারীর প্রতি খুব একটা সিলেক্টিভ হতে পারে না। অনুপ্রবেশকারী ক্ষতিকর বা অক্ষতিকর তা বিবেচনা না করেই প্রতিরোধ গড়ে তোলে। সব বহিরাগত পার্টিক্যালস কেই ধ্বংস করে।
তৃতীয় স্তরের প্রতিরক্ষা-
এ স্তর হচ্ছে স্থায়ী, সক্রিয় এবং শক্তিশালী। এ স্তরটি খুব বেশী স্পেসিফাইড। এ স্তরে নির্দিষ্ট জীবাণুর বিরুদ্ধে স্থায়ী প্রতিরোধ গড়ে তোলে। এক্ষেত্রে ঐ নির্দিষ্ট জীবাণুর নির্যাসকে নিয়ন্ত্রিত উপায়ে কার্যকরী করে দেহে প্রবেশ করানো হয়।
ফলে এরা স্থায়ী প্রতিবন্ধকতা তৈরী করে। যেমন, ভ্যাক্সিন বা টীকা। এতে দেহের অভ্যন্তরীন ইমিউনিটিকেই কাজে লাগানো হয়। তৃতীয় স্তরের চমৎকার ব্যাপার হলো এরা জীবাণুর বিরুদ্ধে প্রতিরক্ষা গড়ে তোলে এবং সেই জীবাণুকে মনে রাখে। এভাবেই এন্টিজেন ও এন্টিবডি এর বিষয়টা প্রতিষ্ঠিত হয়। একটি জীবাণু বা অনুপ্রবেশকারী কে এন্টিজেন এবং তার বিরুদ্ধে প্রতিবন্ধকতা তৈরী কারীকে এন্টিবডি বলে। এন্টিবডি মানবদেহে আগে থেকেই থাকে আর কিছু কৃত্তিম উপায়ে তৈরী করা হয়। এন্টিবডি এর কাজ হলো এন্টিজেনকে সরাসরি আক্রমন করে দেহের কমপ্লিমেন্ট সক্রিয় করা এবং সংক্রমণের বিস্তার ঠেকানো। তৃতীয় প্রতিরক্ষা বাহিনীর আরেক সদস্য হলো স্মৃতি কোষ। এরা জীবাণুর তথ্য নিজেদের কোষে ধারণ করে রাখে। একি জীবাণু দ্বিতীয়বার আক্রমণ করলে তাদেরকে শনাক্ত করতে পারে এবং প্রয়োজনীয় প্রতিরোধ গড়ে তোলে। এভাবেই একটি মানব দেহ সুরক্ষিত থাকে।
তবে প্রাকৃতিক, কৃত্রিম বা পরিবেশগত বিভিন্ন অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা, দূষণ বা অনুজীবের কারণে নানাবিধ স্বাস্থ্য সমস্যা দেখা যায়। মানবদেহের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা যখন অনুপ্রবেশকারীর দ্বারা পরাজিত হয় কেবল তখনই মানুষ অসুস্থ হয়। তাই আমাদের নিজেদের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সম্পর্কে জানতে হবে, স্বাস্থ্যবিধি মানতে হবে। সর্বোপরি নিয়মতান্ত্রিক জীবন যাপন, দেশীয় সংস্কৃতি, রাষ্ট্রীয় আইন মেনে চলে এবং শারীরিক পরিশ্রম, ব্যায়াম ও সুষম খাদ্যাভ্যাস গড়ে তোলে দেহের প্রতিরোধ ব্যবস্থাপনাকে সক্রিয় রাখতে হবে।
বাঁচতে হলে মানতে হবে। আসুন আমরা করোনাভাইরাস এর বিষয়ে সচেতন হই। আমাদের দেহের প্রহরীদের জাগ্রত রেখে ইমিউনিটি বুষ্ট-আপ করি। সরকারি নির্দেশনা মেনে চলি। ঘরে থাকি, নিরাপদ থাকি আর নিরাপদ রাখি। নিজে ভাল থাকি, দেশকে ভাল রাখি।

প্রভাষক, উদ্ভিদবিদ্যা বিভাগ
সরকারি এম এম আলী কলেজ
কাগমারী, টাঙ্গাইল।
jalam1027@gmail.com

রিপ্লাই করুন

অনুগ্রহ করে আপনার মন্তব্য লিখুন
অনুগ্রহ করে আপনার নাম লিখুন