নীড়পাতা অন্যান্য খবর মায়া আপু: এক সফল নারী উদ্যোক্তার জীবন সংগ্রামের গল্প

মায়া আপু: এক সফল নারী উদ্যোক্তার জীবন সংগ্রামের গল্প

মিজান ইমরান

মাত্র ইন্ডিয়ান ইমিগ্রেশন শেষ করে বাহির হলাম, টেক্সিতে উঠেছি উদ্দেশ্য বনগাঁ রেল ষ্টেশনে যাওয়া। পাশের সীটে বসেছেন পয়তাল্লিশোর্ধ এক ভদ্র মহিলা। জিজ্ঞেস করলেন, আপনি কোথায় যাবেন? বল্লাম কলকাতা যাব। আমিও কলকাতা যাচ্ছি। অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলাম, আপনি একা কলকাতা যাচ্ছেন? জি, গত সপ্তাহে গিয়েছিলাম, রুপির সংকটের কারনে মাল ছাড়িয়ে আনতে পারিনি তাই আবার যেতে হচ্ছে। তারপর উনার একটা বিজিনেস কার্ড আমাকে দিলেন। আমিও ভদ্রতা সুলভ আমার একটা কার্ড দিলাম। সত্যি নামের মত কাজ ও উনার, খুব অল্প সময়েই মায়া আপু আপন করে নিলেন ছোট ভাইয়ের মত। দীর্ঘ পথ একসাথে পাড়ি দিয়ে আমরা কলকাতা পৌছালাম। কাজ শেষ করে দুইদিন পর ঢাকা চলে আসি। মায়া আপুর কাজ শেষ হয়নি তাই উনি থেকে গেলেন।

হঠাৎ একদিন দেখি মায়া আপু এ্যাড দিছেন আমাকে, আমি জানতাম না উনি ফেইসবুকে একটিভ আছেন। উনার প্রোফাইল ঘুরে যখন দেখলাম বিবিসি বাংলা উনাকে নিয়ে একটা প্রতিবেদন ছেপেছে। গর্বে শত গুন শ্রদ্ধা বৃদ্ধি পেয়ে গেল উনার প্রতি। বিবিসির বিশেষ অনুষ্ঠানমালা ‘শত নারী’তে তাঁর জীবন সংগ্রাম আর সাফল্যের গল্প শুনিয়েছেন তিনি: “১৯৯৮ সালে আমার স্বামী মারা যান ক্যান্সারে। তখন আমার দুটি বাচ্চাই ছোট। তখন এদের নিয়ে কোথায় যাব, কী করবো বুঝতে পারছিলাম না। ভাইবোন ছিল। তাদের কাছে যেতে পারতাম। আমার আসলে কারও দয়ায় বাঁচতে ইচ্ছে করলো না। তখন থেকেই কাজ শুরু করি। শখের বশে হাতের কাজ শুরু করেছিলাম ১৯৯৬ সালে। কিন্তু যখন এটি আমার প্রয়োজন হয়ে দাঁড়ালো তখন পুরোপুরি এ কাজেই নেমে পড়ি। বাসায় বসেই নিজের আত্মীয়-স্বজন পরিচিত জনদের কাছে বিক্রি করতাম। মেয়েদের জন্য আসলে কোন কাজই সহজ নয়। এখন দেশ অনেক এগিয়েছে। এখন অনেকের সহযোগিতা পাচ্ছি। কিন্তু সেই সময়, শুরুর সময়, তখন কিন্তু কোন সহযোগিতা ছিল না। পারিবারিকভাবেও সহযোগিতা পাইনি।

আমি পুরোপুরি ব্যবসা শুরু করি ২০০০ সালে। দোকান দিলাম, ট্রেড লাইসেন্স নিলাম, কারখানা খুললাম। মানে একটা বিজনেস করতে যা যা লাগে। সেটা আমি ২০০০ সালেই শুরু করলাম। তখন সবাই সহজভাবে নিত না। আমার বাড়ির লোকজনও না। আমার প্রতিবেশিরাও না, আত্মীয়-স্বজনরাও না। সারাদিন বাইরে কাজ করি, সারাদিন বাইরে ঘুরে বেড়াই। তাদের ধারণা ছিল বাউন্ডুলে টাইপের হয়ে গেছি। তারপর যখন গ্রামের মেয়েদের কাজ শেখাতে যেতাম, তাদের স্বামীরাও মেনে নিত না। আমার সামনেই অনেক সময় ওদেরকে মারধোর করতো। আমার সামনেই মুখের ওপর বলতো, আর আসবেন না। কতদিন নিজেরই মনে হয়েছে, এসব আর করবো না। এখন তো সবাই গর্ব করে। সামনে অনেক ভালো কথা বলে। আমার সাফল্য নিয়ে আলোচনা করে। কিন্তু একটা সময় একরকম একঘরেই ছিলাম। আমি এসব কথা শুনতাম না। কারও কথা শুনতাম না বলে নিজেই কারও কাছে যেতাম না, কারও সাথে মিশতাম না। কিন্তু এখন আমার বন্ধুরা সবাই ফিরে এসেছে, আত্মীয়-স্বজনরা ফিরে এসেছে। এখন আমি অনেক ভালো একটা পজিশনে।

আমার হস্তশিল্পের কারখানায় দেড় হাজারের ও বেশি শ্রমিক কাজ করে। আমাকে নিয়ে তারা এখন গর্ব করে। তখন আমার বাচ্চারা ছিল ছোট। অনেকে মনে করতো আমি আমার বাচ্চাদের বড় করতে পারবো না। কিন্তু এই কাজ করেই তো আমি আমার বাচ্চাদের মানুষ করেছি। আমার ছেলে মির্জাপুর ক্যাডেট কলেজে পড়াশোনা করেছে। এরপর ইঞ্জিনিয়ারিং পাস করে এখন আইবিএ থেকে এমবিএ করছে। আমার মেয়ে ঢাকা সিটি কলেজে বিবিএ পড়ছে। আমি আসলে এই কাজ করেই কিন্তু আমার বাচ্চাদের এ পর্যন্ত নিয়ে এসেছি। সমাজে একটা গ্রহণযোগ্যতা এসেছে। এখন পরিবারের লোকজন, আত্মীয়-স্বজন, সবাই আমাকে নিয়ে গর্ব করেন। আমার উদাহরণ টানেন, আমাকে উদাহরণ হিসেবে ব্যবহার করেন।”

সফলতার গল্পটি তুলে ধরেছেন: মিজান ইমরান

রিপ্লাই করুন

অনুগ্রহ করে আপনার মন্তব্য লিখুন
অনুগ্রহ করে আপনার নাম লিখুন