নীড়পাতা প্রবাসের সেতুবন্ধন যুক্তরাজ্যে বাংলাদেশিদের অগ্রযাত্রার নেপথ্যগাথা

যুক্তরাজ্যে বাংলাদেশিদের অগ্রযাত্রার নেপথ্যগাথা

1
0

 

সম্ভাবনার ডেস্ক:

মুনজের আহমদ চৌধুরীমুনজের আহমদ চৌধুরী

অর্থনৈতিক দিক থেকে যুক্তরাজ্যে এখন আর আগের সেই সুদিন নেই। স্যোশাল ওয়েলফেয়ারসহ সব সেবা খাতে চলছে শুধু বাজেট কমানোর ধারা। এ কারণে ব্রেক্সিট-পরবর্তী সময়ে অর্থনীতির গতি কোন পথে ধাবিত হবে, তা নিয়ে সংশয়ে ব্রিটিশরাও। এমন বাস্তবতায় ব্রিটেনে রোমানিয়ান, বুলগেরিয়ান, সিরিয়ানদের পাশাপাশি এখনও পাকিস্তানি কমিউনিটিকেও ব্রিটিশ সামাজিকতায় রাষ্ট্রটির বোঝা মনে করা হয়। এর মূল কারণ হিসেবে দায়ী করা হচ্ছে—এই অভিবাসীদের শিক্ষার স্বল্পতা, বেকারত্ব, ব্রিটিশ মূলধারায় অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে নানা আড়ষ্টতা ও বেনিফিট-নির্ভরতা।
আশা জাগানোর মতো খবর হলো, ব্রিটিশ সমাজ ব্যবস্থায় বাংলাদেশিরা এখন বোঝা নয়। তারা ব্রিটেনের ধারাবাহিক অগ্রযাত্রার বাহক। না, এটি কোনও সস্তা বক্তব্য বা মন্তব্য নয়। ভিনদেশি গবেষকদের পরিসংখ্যানই এমন খবর দিচ্ছে। এ খবরটির গুরুত্বের দিক হলো এর প্রেক্ষাপট। কারণ ব্রিটেনে অতীতের পঞ্চাশ বছরের তুলনায় গত দশ বছরে বাংলাদেশি অভিবাসীর হার নেমে এসেছে প্রায় শূন্যের কোঠায়। মাত্র এক প্রজন্ম আগেও ব্রিটেনে এথনিক মাইনোরিটি কমিউনিটির পরিসংখ্যানে বাংলাদেশিরা ছিলেন পিছিয়েপড়াদের তালিকায়। এখন সেটা অতীত। বাস্তবতা পাল্টে গেছে।যুক্তরাজ্যে এককভাবে বাংলাদেশি জনবহুল অঞ্চলের তালিকায় প্রথমেই রয়েছে টাওয়ার হ্যামলেটস। ১৯৯৮ সাল পর্যন্ত ব্রিটেনের স্থানীয় সরকার বিভাগে টাওয়ার হ্যামলেটস ছিল দেশটির সবচেয়ে কম কার্যকর এরিয়া। ২০০৯ সাল পর্যন্ত ব্রিটিশ বাংলাদেশিরা নানা ক্ষেত্রে দেশটির জাতীয় গড় অগ্রগতির চেয়েও অনগ্রসর ছিলেন।

কিন্তু মাত্র নয় বছরের ব্যবধানে ইসলাম ফোবিয়ার মতো বহু বাধা, নেতিবাচকতা সীমাবদ্ধতাকে জয় করেছেন বাংলাদেশিরা। যুক্তরাজ্যের মূলধারার সঙ্গে নিজেদের যুক্ত করেছেন তারা। তবে, এ দেশে দাম্পত্য কলহজনিত সহিংসতা এখনও এখানে বাংলাদেশিদের বড় লজ্জা। গত ২২ অক্টোবর পূর্ব লন্ডন আনহার আলীর হাতে নিজগৃহে খুন হয়েছেন ২৫ বছরের ব্রিটিশ বাংলাদেশি নারী নাজিয়া আলী।নাজিয়ার আলাদা বসবাসরত সাবেক স্বামী আনহার খুনের দায়ে এখন কারাগারে। দ্বিতীয় প্রজন্মের বাংলাদেশিদের সিরিয়ায় ভ্রান্ত জিহাদমুখিতার যে অপবাদ, তার কিছুটা দায়ী আমাদেরও। আশার কথা হলো—যুক্তরাজ্যে বাংলাদেশিদের তৃতীয় প্রজন্মের সময়ে এই নেতিবাচক প্রবণতা দু’টি স্বস্তিদায়কভাবে অনুপস্থিত।

ইউনিভার্সিটি অব ব্রাডফোর্ডের গবেষক ড. পারভীন আখতার তার গবেষণালব্ধ প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছেন, পাকিস্তানের মীরপুর থেকে আসা নাগরিকদের তুলনায় বাংলাদেশের সিলেট থেকে আসা অভিবাসীরা নিজেদের দক্ষতা ও যুক্তরাজ্যের মূলধারার সমাজব্যবস্থায় সামাজিক গুণাবলিতে অনেক বেশি এগিয়ে। বাংলাদেশিরা সহজে যুক্তরাজ্যের মূলধারায় তুলনামূলকভাবে দ্রুত ও সাবলীলভাবে নিজেদের যুক্ত করছেন।

যুক্তরাজ্যের সেবা খাত থেকে শুরু করে সবজায়গায় বাংলাদেশিদের সততা ও সুনামের জয়জয়কার। যুক্তরাজ্যে এয়ারলায়েন্স, মোবাইল ফোন কোম্পানি শুধু গড়ছেন না বাংলাদেশিরা, এসব ক্ষেত্রে ঈর্ষা জাগানিয়া সাফল্যও পাচ্ছেন। এর প্রধান কারণ হলো—তাদের বিনয় ও সততা।  এ কারণে যুক্তরাজ্যে শতবর্ষের প্রাচীন ইন্ডিয়ান রেস্টুরেন্ট ব্যবসায়ে মার খেলেও টার্কিশ রেস্টুরেন্টসহ অন্যান্য ব্যবসায় সাফল্য পাচ্ছেন বাংলাদেশিরা।

এদিকে, ম্যানচেস্টার ইউনিভার্সিটির গবেষক ইয়াওজুন লির এক গবেষণা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, যুক্তরাজ্যে বাংলাদেশিদের কর্মসংস্থানের হার ও আগ্রহ আগের চেয়ে বহুগুণ বেড়েছে। বিশেষ করে জন্মসূত্রে ব্রিটিশ-বাংলাদেশি নারীর পাশাপাশি দেশ থেকে আসা নারীরাও চাকরি ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখছেন। বিশেষ করে খুচরো বিক্রি ও সেবা খাতে। আগামী এক দশকে যার বড় সুফল পাবে ব্রিটিশ-বাংলাদেশি কমিউনিটি।

শতাধিক বছরের ইতিহাসের পথ বেয়ে যুক্তরাজ্যে বাংলাদেশি কমিউনিটি আজ শক্ত ভীতের ওপর দাঁড়িয়ে। ২০১৫ সালে ৬২ শতাংশ ব্রিটিশ-বাংলাদেশি শিক্ষার্থী গণিত ও ইংরেজি পাঁচটি বিষয়ে সর্বোচ্চসংখ্যক নম্বর পান জিসিএসই-তে। গত তিন বছরে জিসিএসই’র ফল আনন্দের বার্তা বয়ে এনেছে। ফ্রি স্কুল মিল (এফএসএম) এখানে অন্য যেকোনও জাতিগত সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের শিশুদের চেয়ে বাংলাদেশিরা বহুগুণ বেশি সাফল্য পেয়েছে। ‘ডিপার্টমেন্ট অব অ্যাডুকেশন’-এর পরিসংখ্যান তার সাক্ষী।

যুক্তরাজ্যের মোট বাংলাদেশির প্রায় সত্তর শতাংশ বাস করে লন্ডনে। কিন্তু লন্ডনের বাইরে বসবাস করা বাংলাদেশিরাও  শিক্ষাক্ষেত্রে অভাবনীয় সাফল্যের দ্যুতি ছড়াচ্ছেন। ইউনিভার্সিটি অব ব্রিস্টলের ফেলো গবেষক সাইমন বার্গেস তার গবেষণালব্ধ পরিসংখ্যানে উল্লেখ করেছেন, ব্রিটিশ-বাংলাদেশিরা শুধু যে ব্রিটিশ-পাকিস্তানিদের চেয়ে ভালো করছেন লেখাপড়ায় তা নয়,  আরও অনেক জাতিগত সংখ্যালঘু সম্প্রদায়েল চেয়েও তারা এগিয়ে। অতীতের যেকোনও সময়ের চেয়ে ব্রিটিশ-বাংলাদেশিদের বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ ডিগ্রি নেওয়ার আগ্রহ  কয়েকগুণ বেড়েছে।

দ্বিতীয় বা তৃতীয় প্রজন্মের বাংলাদেশিদের অগ্রযাত্রার নেপথ্যে আছে তাদের মেধা, অভিভাবকদের আগ্রহ, পারিবারিক মূল্যবোধ। বাংলাদেশি মা-বাবারা কেবল স্কুলে সন্তানদের জন্য টিউশনের টাকার জোগানই দিচ্ছেন না, বিশ্ববিদ্যালয়গামী সন্তানকে জোগাচ্ছেন কুড়ি-ত্রিশ হাজার পাউন্ডও। মা-বাবারা নিজেদের সঞ্চয়ের সবটুকু দিচ্ছেন সন্তানের লেখাপড়া আর ভবিষ্যতের জন্য। অথচ, এক প্রজন্ম আগে অভিভাবকরা সে বিনিয়োগটি করতেন দেশে বা লন্ডনে বাড়ি ঘর তৈরি বা কিনতে। এ সচেতনতাও বড় ভূমিকা রাখছে যুক্তরাজ্যে বাংলাদেশি প্রজন্মকে গড়ে তুলতে।

এসবের পরও একটি মন্দ দিক রয়েছে। সেটি হলো—যুক্তরাজ্যে বাংলাদেশি কমিউনিটির টিভি চ্যানেলগুলোয় প্রায় বছরজুড়ে নানা ছুঁতোয় ভিক্ষাবৃত্তি চলে। সেসব চ্যারিটিতে ডকুমেন্টারির নামে দেখানো হয় বাংলাদেশের ছিন্নমূল, বঞ্চিত, প্রতিবন্ধী মানুষের আর্তি। ব্রিটিশ বাংলাদেশি শিশুরা যারা বছরে বা কয়েক বছরে একবার মা-বাবার সঙ্গে বাংলাদেশে যায়। অনেকে আছে যারা সারাজীবনে একবার দেশে গেছে। তাও সপ্তাহ দুয়েকের জন্য। ব্রিটিশ-বাংলাদেশি শিশুরা এসব ডকুমেন্টারি দেখে অনেকে ধারণা করতো, বাংলাদেশ কেবল ভিখারির দেশ। এখন পরিস্থিতি পাল্টে গেছে।

দেশে আসা যাওয়া আর অবারিত তথ্যপ্রবাহের যুগে বাংলাদেশের অর্থনীতিসহ প্রায় ক্ষেত্রে এগিয়ে চলা নিয়ে ব্রিটিশ-বাংলাদেশি আমাদের প্রজন্ম, বাংলাদেশ গিয়ে গর্ব বোধ করেন।

অথচ এর বিপরীতে আমরা কী দেখি? যুক্তরাজ্যে আমাদের ভূ-তাত্ত্বিক অঞ্চলের বৃহত্তম উপমহাদেশীয় কমিউনিটি পাকিস্তানিদের। যারা পাকিস্তানে তো বটেই, যুক্তরাজ্যে জন্ম নেওয়া পাকিস্তানিরা নিজেদের মেয়ে-বোন-ভাতিজিকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করে অন্য জাতি এমনকি গোত্রের ছেলেকে ভালোবাসার অপরাধেও। হত্যা করে লাশ গুম করার চেষ্টা করে। অনার কিলিংয়ে নামে বোনকে, কন্যাকে হত্যা পাকিস্তানিরা ছাড়া দুনিয়ায় আর কেউ করে কিনা, জানি না।

আমার নিজের কথাই বলি। খোদ লন্ডনের কর্মস্থলেও পাকিস্তানি সহকর্মীরা যখন দেশ হিসেবে বাংলাদেশের দ্রুতগতিতে এগিয়ে যাওয়ার কথা বলেন, তখন বুকের ভেতরটা ভরে যায় দেশটাকে নিয়ে। ভারতীয় বংশোদ্ভূত সহকর্মীরা যখন তাদের নিজ দেশে ও প্রবাসে স্বদেশিদের নিয়ে সাম্প্রদায়িক আচরণের জন্য আক্ষেপ করেন, তখন নিজেই বাংলাদেশের অ-সাম্প্রদায়িক সৌহার্দ্যময় সামাজিক বহমানতা নিয়ে গর্বিত হই।

লন্ডনে বাংলাদেশি অধ্যুষিত এলাকাগুলোয় একই সড়কে একাধিক মসজিদ রয়েছে। প্রায়  মসজিদেরই পরিচালনায় বাংলাদেশিরা। পরিচালনা কমিটির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে মসজিদের ভেতরে মারামারি, মামলার যে নেতিবাচকতা আমাদের রয়েছে, তাও কিন্তু ব্রিটিশ-পাকিস্তানিদের কু-সংস্কৃতির অনুকরণ।

যুক্তরাজ্যের মূলধারায় আমাদের প্রজন্মকে আরও এগিায়ে নেওয়াসহ প্রতিবন্ধকতাগুলো সমন্বিতভাবে দূর করার সময় এখনই।

যুক্তরাজ্যের পার্লামেন্টে তিনজন বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত এমপি রয়েছেন। স্থানীয় সরকারে অর্ধ-শতাধিক বাংলাদেশি কাউন্সিলর। সামনের নির্বাচনে লেবার পার্টি ক্ষমতায় গেলে ব্রিটিশ-বাংলাদেশি অন্তত একজন মন্ত্রিত্ব পাবেন, এটা মোটামুটি নিশ্চিত। বাংলাদেশের বাইরে কেবল ব্রিটেনেই নিকট ভবিষ্যতে বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত মন্ত্রী-প্রধানমন্ত্রী পাওয়ার সম্ভাবনা দিন-দিন বাড়ছে।

দেশটির সাবেক প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরন কয়েকবার তার বক্তৃতায় বলেছেন, তিনি তার জীবদ্দশায় ব্রিটেনে ব্রিটিশ-এশিয়ান প্রধানমন্ত্রী দেখে যেতে চান। আশা করি, ডেভিড ক্যামেরন, তার জীবদ্দশায় একজন ব্রিটিশ-বাংলাদেশি প্রধানমন্ত্রী দেখে যাবেন।

সূত্র: bangla tribune

রিপ্লাই করুন

অনুগ্রহ করে আপনার মন্তব্য লিখুন
অনুগ্রহ করে আপনার নাম লিখুন