নীড়পাতা সকল বিভাগ উপসম্পাদকীয় শিক্ষকদের মাল্টিমিডিয়া কনটেন্ট এর মাধ্যমে পাঠদান পরিকল্পনা

শিক্ষকদের মাল্টিমিডিয়া কনটেন্ট এর মাধ্যমে পাঠদান পরিকল্পনা

165
0

কাজী আরিফুর রহমান:


‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’ শ্লোগান নিয়ে বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ সরকার বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে ২০০৯ সালের ২৫ জানুয়ারি সরকার গঠন করে। ২০০৮ সালের ২৮ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচনের প্রাক্কালে তাদের নির্বাচনী ইশতেহার (রূপকল্প/২০২১) এর উল্লেখযোগ্য অংশ জুড়ে আকর্ষণীয় দিক ছিল ডিজিটাল বাংলাদেশের রূপরেখা। এই রূপরেখা এমন এক সময় তৈরী করা হয় যখন বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশগুলোর অন্যতম। যে দেশর মানুষেরা তাদের মৌলিক চাহিদা পূরণেরই হিমশিম খাচ্ছে সেখানে আবার প্রযুক্তির ব্যবহার! এ নিয়ে ঠাট্টা মসকরাও কম হয়নি। যাই হোক ক্ষমতা গ্রহণের পরপরই সরকার তার নির্বচনী ইশতেহার বাস্তবায়নে পদক্ষেপ নিতে শুরু করে। অন্যান্য বিষয়ের মতো ডিজিটাইজেশনের দিকটাও সমান গুরুত্ব পায়। আর এ জন্য শিক্ষাক্ষেত্রে প্রযুক্তির ব্যবহারকে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করা হয়। সরকার বিদ্যালয়ে পাঠদানের জন্য মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম চালুর মাধ্যমে শিক্ষা ক্ষেত্রে যুগান্তকারী সফলতা লাভ করে।
আমরা একুশ শতকের ডিজিটাল যুগের মানুষ। এই প্রতিযোগিতামূলক বিশ্বে আমাদের ছাত্রছাত্রীদের টিকে থাকার জন্য একুশ শতকীয় কারিকুলাম অনুসরণ করতে হবে। একুশ শতকীয় কারিকুলামের একটা গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট হলো, এটি আন্ত:বৈষয়িক, প্রজেক্টভিত্তিক ও গবেষণা-চালিত। এটি জাতীয় ও বিশ্বপর্যায়ের কমিউনিটির সাথে জড়িত। আর এ কারিকুলামের সাথে পরিচয় করতে পারে একটি মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম।

মাল্টিমিডিয়া শব্দটিকে বিশ্লেষণ করলে দুটি শব্দ পাওয়া যায়, যথা: মাল্টি (সঁষঃর) ও মিডিয়া (সবফরধ)। মাল্টি অর্থ বহু আর মিডিয়া অর্থ মাধ্যম। অর্থাৎ মাল্টিমিডিয়া শব্দের অর্থ বহুমাধ্যম। একটি মাল্টিমিডিয়া ক্লাশরুমে কম্পিউটার প্রযুক্তি ব্যবহার করে লেখালেখি (ঃবীঃ), গ্রাফিক্স (মৎধঢ়যরপং) , অডিও (ধঁফরড়), ভিডিও (ারফবড়), ইন্টারনেট (রহঃবৎহবঃ) ইত্যাদিসহ আরো বহু মাধ্যমে কাজ করা যায়। সহজ কথায় বলতে গেলে মাল্টিমিডিয়া ক্লাশরুম এমন একটি ব্যবস্থা যেখানে প্রচলিত শ্রেণিকক্ষের আমূল পরিবর্তন না করে একটি ইন্টারনেট সংযোগসহ মাল্টিমিডিয়ার বিভিন্ন যন্ত্রপাতি ও প্রচলিত উপকরণ যেমন: চক, ডাস্টার, প্রভৃতি ব্যবহার করে শ্রেণি কার্যক্রমকে আরও আকর্ষণীয়, আনন্দময় ও কার্যকর কারার জন্য শিক্ষক প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে পাঠ্যাংশটুকু মাল্টিমিডিয়া প্রেজেন্টেশনের মাধ্যমে উপস্থাপন করবেন এবং প্রয়োজনবোধে ইন্টারনেট সার্চ করে শিক্ষার্থীর পাঠ সংশ্লিষ্ঠ প্রশ্নের কৌতুহল মেটাবেন।

সরকার ২০১০ সালে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের একসেস টু ইনফরমেশন (এটুআই) প্রোগ্রামের উদ্যোগে ৭টি বিদ্যালয়ের ২৩ জন শিক্ষক নিয়ে পাইলট আকারে মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম কার্যক্রম শুরু করে। এ পাইলট কর্মসূচির অভিজ্ঞতার প্রেক্ষিতে এটুআই প্রোগ্রামের সহযোগিতায় শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় সারাদেশে পঁচিশ হাজারেরও বেশি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম স্থাপন করেছে। এটুআই প্রোগ্রামের সহযোগিতায় শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে ২০১০ সাল থেকে এ পর্যন্ত ৫৫ হাজারেরও বেশি প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষককে মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম ও ডিজিটাল কনটেন্ট তৈরি বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছ। এই মাল্টিমিডিয়া ক্লাস আমাদের ছাত্রছাত্রীদেরকে একটি আদর্শ শিখন পরিবেশের সাথে পরিচয় করে দিয়েছে। সেই সাথে বিশ্ব জ্ঞানভান্ডারের সাথে শিক্ষক-শিক্ষার্থী-অভিভাবকের মধ্যকার সেতুবন্ধ বা সংযোগ স্থাপন সম্ভব হয়েছে।

‘তথ্য-প্রযুক্তি শিক্ষা নয়, শিক্ষায় তথ্য-প্রযুক্তির ব্যবহার’- এই শ্লোগানকে সামনে রেখে ২০১২ সালের ২০ মে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশের সকল মাধ্যমিক ও প্রাথমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম ও শিক্ষক কর্তৃক ডিজিটাল কনটেন্ট তৈরি কার্যক্রম উদ্বোধন করেন। এখানে লক্ষনীয় যে ডিজিটাল কনটেন্ট তৈরী বা মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম এর মানে এই নয় যে কম্পিউটার শিক্ষা বা তথ্য প্রযুক্তি শিক্ষার মতো কোনো বিষয়। উপরের শ্লোগানই বলে দেয় যে এর মানে হচ্ছে শিক্ষা ক্ষেত্রে প্রযুক্তিগত উপকরণগুলোই ব্যবহার করা। এ নিয়ে অনেকের মধ্যে ভুল ধারণা কাজ করত যে, মাল্টিমিডিয়া মানে কম্পিউটার শিক্ষা, শিক্ষার্থীদেরকে কম্পিউটারের উপর লেকচার দিতে হবে, শিক্ষকদের গুরুত্ব কমিয়ে প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো, কম্পিউটার ল্যাব ছাড়া ক্লাস করা যাবে না ইত্যাদি। তবে এখন তা সকলের কাছে অনেকটা পরিষ্কার হয়ে এসেছে। উদাহরণস্বরূপ, মহাবিশ্ব, প্রাকৃতিক সপ্তাশ্চর্য, মুক্তিযুদ্ধ, প্রাকৃতিক দূর্যোগ ইত্যাদি বিষয় পড়ানোর ক্ষেত্রে ছবি, অ্যানিমেশন বা ভিডিও’র কোন বিকল্প নেই। এভাবে ইংরেজি, বাংলা, সমাজ, ধর্মসহ প্রতিটি বিষয়ে শিক্ষার্থীদের সুস্পষ্ট ও বৈশ্বিক ধারণা মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুমের মাধ্যমে দেওয়া যেতে পারে। এখানে মূল বিষয়ের স্বকিয়তা বজায় থাকবে। শুধু শিখন-শিখানো কৌশলে উপকরণের পরিবর্তন সাধিত হয়েছে।
মাল্টিমিডিয়া ক্লাসের মাধ্যমে গতানুগতিক শিক্ষক-কেন্দ্রিক শিক্ষা কার্যক্রমকে শিক্ষার্থী-কেন্দ্রিক আনন্দময় শিক্ষায় রূপান্তর করেছে। শিক্ষকগণ নিজেদের তৈরিকৃত ডিজিটাল কনটেন্ট ব্যবহার করে অত্যন্ত আনন্দদায়ক ও কার্যকরভাবে শ্রেণিপাঠ পরিচালনা করছেন এবং শিক্ষার্থীরা শ্রেণিকক্ষে অংশগ্রহণমূলক পরিবেশে শিখতে পারছে। এর মাধ্যমে পাঠকে আকর্ষণীয় করে উপস্থাপন করা, কঠিন বিষয় সহজভাবে তুলে ধরা, শিক্ষার্থীদের সহজে শিখন কার্যক্রমে সম্পৃক্ত করা এবং সৃজনশীল প্রশ্নের অনুশীলন কার্যক্রম খুব সহজভাবেই পরিচালনা করা যায়। আগে তথ্য-প্রযুক্তির উপকরণগুলোকে শুধু মাত্র বিনোদনের মাধ্যম হিসেবেই ব্যবহার করা হতো। আর বর্তমানে এই উপকরণগুলো ব্যবহার করেই ক্লাস পরিচালনা করায় শীক্ষার্থীরা বেশি মনোযোগ দেয় বা তারা অধিক কৌতুহল বোধ জাগ্রত হয়। একজন চীনা দার্শনীক শিখন কার্যক্রমে এক হাজার শব্দের চেয়ে একটি ছবিকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছিলেন। সে হিসেবে মাল্টিমিডিয়া ক্লাসে ছবির পাশাপাশি ভিডিও প্রদর্শনের মাধমে তা আরও সহজতর করা সম্ভব হয়েছে। এটা যে শুধু ছাত্রছাত্রীদের জন্য সুবিধা হয়েছে তা নায় বরং তা শিক্ষকদের শিক্ষাদান কাজটি আরও আকর্ষণীয় ও ফলপ্রসূ হয়েছে।

মাল্টিমিডিয়া ক্লাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো এর মাধ্যমে শিক্ষার বিশ্বায়ন হয়েছে। শিক্ষার্থীদের জ্ঞান লাভের ক্ষেত্রে বৈষম্য দূর করা সম্ভব একটি মাল্টিমিডিয়া ক্লসের মাধ্যমে। একজন শিক্ষক তার কনটেন্ট তৈরী করতে বিশ্বের যেকোনো প্রান্তের শিক্ষা ব্যবস্থাকে অনুসরণ করতে পারেন। বাংলাদেশের সকল শিক্ষককে একটি কমন প্ল্যাটফরমে নিয়ে আসার জন্য ব্রিটিশ কাউন্সিলের সহযোগিতায় এটুআই প্রোগ্রাম শিক্ষক বাতায়ন (িি.িঃবধপযবৎং.মড়া.নফ) তৈরি করেছে। শিক্ষকগণ তাদের তৈরিকৃত ডিজিটাল কনটেন্ট, ভিডিও, এ্যনিমেশন এখানে শেয়ার করছেন এবং অন্যান্য শিক্ষকগণ তা প্রয়োজনে ডাউনলোড করছেন। শিক্ষক বাতায়নে মোট ৪৫০০০ জন শিক্ষক রয়েছেন যারা নিয়মিত ডিজিটাল কনটেন্ট আপলোড করছেন ও ডাউনলোড করছেন। এখানে ২৫ হাজারের বেশি ব্লগপোস্ট ও ১২ হাজারের বেশি ডিজিটাল কনটেন্ট রয়েছে। শিক্ষক বাতায়নের সদস্য সংখ্যা দিন দিন বেড়েই চলেছে। এর ফলে শহরের শিক্ষার্থীরা যে পদ্ধতীতে শিখন কার্যক্রমের সাথে যুক্ত হচ্ছে, গ্রামের শিক্ষার্থীরা তা থেকে মোটেও বঞ্চিত হচ্ছে না। জেলা-উপজেলা প্রশাসন, জেলা-উপজেলা শিক্ষা অফিস ও টিচার্স ট্রেইনিং কলেজ সমন্বিতভাবে মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম মনিটরিং ও মেইনটেনিং এর কাজ করছে। এটুআই প্রোগ্রাম থেকে একটি ড্যাশবোর্ড চালু করে বর্তমানে মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও মাদ্রাসাতে তা মনিটরিং করা হচ্ছে। ভবিষ্যতে তা কারিগরি শিক্ষায়ও শুরু হবে।

২০১৩ সালে পিএমআইডি এর মাধ্যমে ১৫৮টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে নিয়ে মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুমের একটি ইমপ্যাক্ট স্ট্যাডি করা হয়েছিল। গবেষণার ফলাফলে দেখা যায় যে, যে সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুমের মাধ্যমে পাঠদান হয়েছে, সেখানে শিক্ষার্থীরা সহজে এবং ভালোভাবে পাঠ বুঝতে পারে এবং তাদের মুখস্ত বিদ্যার প্রবণতা কমেছে। তাছাড়া শিক্ষার প্রতি তাদের আগ্রহও বেড়েছে।
বিয়ানীবাজার উপজেলার প্রাথমিক শিক্ষায় তথ্য প্রযুক্তির প্রসারের লক্ষ্যে মাননীয় শিক্ষামন্ত্রী মহোদয়ের টি আর/কাবিখা প্রকল্পের আওতায় ১০৫ টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে মাল্টিমিডিয়া প্রজেক্টর ও ল্যাপটপ এবং প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের মাধ্যমে পর্যায়ক্রমে সকল বিদ্যালয়ে মাল্টিমিডিয়া সরবরাহ নিশ্চিত করা হয়েছে। শিক্ষকরা আন্তরিকভাবে কনটেন্ট তৈরি করে শ্রেণিকক্ষে পাঠদান কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছেন। ফলশ্রুতিতে মানসম্মত প্রাথমিক শিক্ষা নিশ্চিত করা সম্ভব হয়েছে এবং পাশাপাশি আমাদের ক্ষুদে শিক্ষার্থীরা তথ্যপ্রযুক্তি বিষয়ে প্রাথমিক ধারণা পাচ্ছে এবং উৎসাহ উদ্দীপনা নিয়ে বিদ্যালয়মুখী হচ্ছে।

শ্রেণিকক্ষে মাল্টিমিডিয়া কার্যক্রম বিয়ানীবাজারের শিক্ষার্থীদের জন্য শিক্ষাক্ষেত্রে বিপ্লব সাধন করেছে। শহরের স্বনামধন্য বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা অভিজ্ঞ শিক্ষকদের দ্বারা যে পাঠ গ্রহণ করছে, আমাদের শিক্ষার্থীরাও মাল্টিমিডিয়া ক্লাসের মাধ্যমে তা সহজেই পেয়ে যাচ্ছে। আমাদের শিক্ষার্থীরা আধুনিক জ্ঞান বিজ্ঞানের সাথে পরিচিত হয়ে তাদের শিক্ষা জীবন শুরু করায় তা তাদের ভাবিষ্যৎ জীবনে ফলপ্রসূ হবে।

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সুযোগ্য কন্যা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আজ জাতিসংঘ বাংলাদেশকে উন্নয়নশীল দেশের যোগ্যতা অর্জনের স্বীকৃতি দিয়েছে। ২০২১ সালের আগেই আমরা রূপকল্প ২০২১ বাস্তবায়নে সক্ষম হয়েছি। সেই সাথে ২০৪১ সালের মধ্যেই একটি উন্নত ও সমৃদ্ধ স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়তে আমরা বদ্ধপরিকর।

কাজী আরিফুর রহমান
উপজেলা নির্বাহী অফিসার
বিয়ানীবাজার, সিলেট।
ই-মেইলঃ unobeanibazar@mopa.gov.bd

রিপ্লাই করুন

অনুগ্রহ করে আপনার মন্তব্য লিখুন
অনুগ্রহ করে আপনার নাম লিখুন