নীড়পাতা সকল বিভাগ উপসম্পাদকীয় শিশুদের মানসিক বিকাশে “স্কুল গার্ডেনিং” এর ভূমিকা

শিশুদের মানসিক বিকাশে “স্কুল গার্ডেনিং” এর ভূমিকা

96
0

কাজী আরিফুর রহমান:


জাতীয় শিক্ষানীতি, ২০১০- এর মুখবন্ধে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের মাননীয় শিক্ষামন্ত্রী জনাব নুরুল ইসলাম নাহিদ এমপি বলেন, “জোর-জবরদস্তি করে শিক্ষাদান নয়, শিশুদের শিক্ষার পরিবেশ, পাঠদান পদ্ধতি ও বিষয়বস্তু আকর্ষনীয় ও আনন্দময় করে তুলতে হবে। আমাদের জাতির স্বপ্ন বাস্তবায়িত করে তুলতে আমাদের তরুণ প্রজন্মকে প্রকৃত শিক্ষা, জ্ঞান ও প্রযুক্তিতে দক্ষ মানব সম্পদ হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। একই সঙ্গে নৈতিক মূল্যবোধ, জনগণের প্রতি শ্রদ্ধাশীল ও দায়বদ্ধ এবং দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ নতুন প্রজন্ম গড়ে তোলাই হবে এ শিক্ষানীতির মূল লক্ষ্য।” তাঁর এই সংক্ষিপ্ত বক্তব্যে শিক্ষা খাতে সরকারের পরিকল্পনার মূল চিত্র ফুটে ওঠে। তাঁর এই বক্তব্য এবং শিক্ষানীতি দুটিই পরবর্তী সময়ে সরকার অক্ষরে অক্ষরে বাস্তবায়ন করে। শিক্ষা ব্যবস্থায় নিয়ে আসা হয় বিরাট পরিবর্তন। পুঁতিগত বিদ্যার পরিবর্তে শিশুদের জন্য তৈরী করা হয় বাস্তবমুখি প্রয়োগিক শিক্ষা। শিশুদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশে বিদ্যালয়গুলোকে ঢেলে সাজনো হয়েছে।

প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে সরকার গৃহীত “স্বপ্নের স্কুল কার্যক্রম” এর মধ্যে অন্যতম হলো “স্কুল গার্ডেনিং”। বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে স্বল্প পরিসরে এবং পরিকল্পিত উপায়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় গড়ে ওঠা বাগানই “স্কুল গার্ডেনিং” বা বিদ্যালয় বাগান। প্রাথমিক স্তর থেকেই কোমলমতি শিক্ষার্থীদের তত্ত্বীয় শিক্ষার পাশাপাশি ব্যবহারিক তথা হাতে কলমে শিক্ষা প্রদানের উদ্যেশ্যে প্রতিটি বিদ্যালয়ে বাগান করা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। বিদ্যালয়ের সীমানার ভেতরে একটি নির্দিষ্ট জায়গায় এই বাগান তৈরী করা হয়। বাগান ব্যবস্থাপনার মূল দায়িত্ব অর্পিত হয় ছাত্রছাত্রীদের উপর। অবশ্য এ সাথে শিক্ষকদের সহযোগীতাতো থাকবেই। এই বাগানে মালী বা কৃষকের ভূমিকা পালন করবে স্কুলগামী শিক্ষার্থীরা। তারা রুটিন অনুযায়ী নির্দিষ্ট সময় ধরে বাগান ব্যবস্থাপনার যাবতীয় কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করবে। তারা বীজতলা তৈরি, বীজ সংগ্রহ, চারা উৎপাদন, সার প্রয়োগ, পানি সেচ, পরিচর্যা, পরিবহন, বিপনন ইত্যাদি সকল ক্ষেত্রে অংশ নেবে। “স্কুল গার্ডেনিং” স্লোগান হবে ‘কৃষি শিখি দেশ গড়ি’। বিদ্যালয় বাগানে দৃষ্টিনন্দন বিভিন্ন ধরনের ফুল, ফল, শাকসবজি, ভেষজ, বনজ গাছের পাশাপশি গুরুত্বপূর্ণ কৃষিজাত শস্য জন্মানো হয়। এই “স্কুল গার্ডেনিং” ব্যবস্থাপনায় যাবতীয় ব্যয়ভার বহন করে স্কুল ব্যবস্থাপনা কমিটি।

শুধুমাত্র পুঁতিগত বিদ্যায় প্রাণের স্পন্দন জাগে না। শিক্ষা আনন্দময়। আনন্দদায়ক শিক্ষার পরিবেশ সৃষ্টির মূল শর্ত হচ্ছে শিক্ষার্থীর সুস্বাস্থ্য। শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্য সুরক্ষা ও পুষ্টির চাহিদা পূরণে বিদ্যালয় বাগান তাৎপর্যপূর্ণ অবদান রাখতে সক্ষম। বিদ্যালয় বাগান যেন একটি জিবন্ত বিদ্যাপিঠ। এখানে কোমলমতি শিশুরা প্রকৃতির নিবিড় সান্নিধ্যে আসার সুযোগ পাবে। প্রকৃতি পর্যবেক্ষণ ও প্রকৃতি পাঠের মাধ্যমে শিশুদের মনোদৈহিক ও বৃদ্ধিবৃত্তিক বিকাশ ঘটবে। পাশাপাশি বাগান আমাদের পরিবেশের সবচেয়ে বড় বন্ধু। এই দেশকে এবং পৃথিবীকে আমাদের সবার বসবাসের উপযোগী রাখতে হলে পরিবেশ হতে হবে দূষণমুক্ত, নির্মল, সুন্দর এবং সবার জন্য নিরাপদ। বিদ্যালয় বাগান আমাদের বসবাসের উপযোগী পৃথিবীর জন্য উপকারী। বিদ্যালয় বাগান শুধু যে বর্তমান পরিবেশের জন্য উপযোগী তা নয়, এটি ভবিষ্যৎ জীবনের প্রস্তুতি স্বরূপ। কারণ এখানে শুধুই একটি বাগান করা হয়না এর মাধ্যমে বাগান করার প্রশিক্ষণ হাতে কলমে প্রদান করা হয়।

বিদ্যালয় বাগানের মাধ্যমে আমাদের ছাত্রছাত্রীদের মনে যেকোনো কাজের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ জাগ্রত করা হয়। ভালো মনের মানুষ হিসেবে গড়ে উঠতে না পারলে সার্টিফিকেটের কোনো দাম নেই। যদি আমরা উন্নত বিশ্বের দিকে তাকাই, তাহলে দেখতে পাই, সেখানকার জনসাধারণের মধ্যে বৃত্তিমূলক শিক্ষার প্রচলণ এবং গুরুত্ব বেশি। তাদের উন্নতির পেছনে বৃত্তিমূলক শিক্ষাই মূল মন্ত্র হিসেবে কাজ করে। তারা সার্টিফিকেটে বিশ্বাসী নয়, কাজে বিশ্বাসী। তারা কোনো কাজকেই খাটো করে দেখে না। তাই সে সকল দেশে বৃত্তিমূলক শিক্ষার পর্যাপ্ত সুযোগ রয়েছে। উন্নত দেশে শিক্ষা মানেই কাজ, চাকরি। তারা জীবন ও প্রয়োজন অনুযায়ী শিক্ষা লাভ করে। আর এখানেই আমরা পিছিয়ে ছিলাম। তবে বর্তমানে আমাদের সরকার বৃত্তিমূলক শিক্ষাকে প্রাধান্য দিচ্ছে। বিদ্যালয় বাগান তার একটি উদাহরণ মাত্র।
বিদ্যালয় বাগানে শিক্ষার্থীরা মনের আনন্দে কাজ করে। এখানে তাদের মানসিক উন্নতির পাশাপাশি শারীরিক বিকাশ সাধন হচ্ছে। পাশাপাশি তারা উন্নত কৃষি প্রযুক্তির সাথে পরিচিত হওয়ার সুযোগ পাচ্ছে। কম জায়গায় কিভাবে বেশি ফসল উৎপাদন করা যায়, সে কৌশল তাদের শেখানো হয় এই বিদ্যালয় বাগানে। বাংলাদেশ কৃষি ভিত্তিক অর্থনীতির দেশ। এখানকার কৃষকরা আধুনিক কলাকৌশল সম্পর্কে অবগত না হওয়ায় আমরা কৃষিতেও কাঙ্খিত লক্ষ্যে পৌছতে পারিনা। বিদ্যালয় বাগান আমাদের শিশুদেরকে কৃষির বৈজ্ঞানীক পদ্ধতির সাথে পরিচয় করিয়ে দেয়। সেই সাথে ছাত্রছাত্রীদের মাধ্যমে সমাজের সর্বত্র এই বার্তাটা অতি সহজে পৌছে যায়। ফলে আমাদের সমাজে কৃষি বিপ্লব সাধিত হচ্ছে।

টেকসই উন্নয়নের পূর্বশর্ত দারিদ্র্য বিমোচন, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও পরিবেশগত উন্নয়নসহ সামগ্রিক উন্নয়ন। মানব সম্পদ উন্নয়নে প্রাথমিক শিক্ষাকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা যায়। জিবনধর্মী ও কর্মমুখী শিক্ষার মাধ্যমে দক্ষ মানবসম্পদ সৃষ্টি করা সম্ভব। প্রাথমিক শিক্ষার লক্ষ্য হলো শিশুর দৈহিক, মানসিক, সামাজিক, আধ্যাত্মিক, নৈতিক, মানবিকও নান্দনিক বিকাশ সাধনে এবং তাকে উন্নত জিবনের স্বপ্ন দর্শনে উদ্বুদ্ধ করা। বিদ্যালয় বাগান এই লক্ষ্য বাস্তবায়নে অত্যন্ত ফলপ্রসু ভূমিকা রাখতে পারে।
সুসজ্জিত ও সমৃদ্ধ বিদ্যালয় বাগান হতে পারে একটি সুন্দর বিনোদনের মাধ্যম। বাগানকে লক্ষ্য করে বেকার যুবকরা কর্মসংস্থানের জন্য একে পেশা হিসেবে গ্রহণ করার অনুপ্রেরণা পাবে। বৃক্ষরোপণের ক্ষেত্রে এলাকায় গণজাগরণ সৃষ্টি হবে। অর্থনীতিতে চাঙ্গাভাব পরিলক্ষিত হবে। খাদ্য সমস্যা থাকবে না। ক্ষুধা, দারিদ্র, অপুষ্টি, বেকারত্বের মতো বহু জটিল সমস্যার সমাধান সম্ভব হবে।
শিশুরা সুন্দরের পূজারী। বিদ্যালয়কে শিশুদের কাছে আকর্ষনীয় করার ব্রতী নিয়েই সরকার “স্বপ্নের স্কুল কর্যক্রম” হাতে নিয়েছে। এরই অংশ হিসেবে এই বিদ্যালয় বাগান। একটি আকর্ষনীয় বাগান বিদ্যালয়ের সৌন্দর্য বর্ধনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। শিশুদেরকে বাগান ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব দেয়ায় তারা তা পালন করে দায়িত্বশীল হওয়ার অনুশীলন করে। তারা রুটিন করে দৈনিক বাগানে কাজ করাতে দশে মিলে কাজ করার সুযোগ পায়। বিদ্যালয়ের পরিবেশ সুন্দর হওয়াতে পড়ালেখার উপযুক্ত পরিবেশ সৃষ্টি হয়। তারা পড়ালেখায় বেশি মনোযোগ দিতে পারে। শিশুদের মন সুন্দর হয়। সুন্দর মনে পৃথিবীকে সুন্দর ভাবে ভাবতে শিখে।

বর্তমান সরকারের নেতৃত্বে বাংলাদেশ এখন উন্নয়নের রোল মডেল। আজ বাংলাদেশের উন্নয়নকে গোটা বিশ্ব স্বীকৃতি দিচ্ছে। কেন দিচ্ছে তা বুঝতে হলে আগে সরকারের কার্যক্রমকে পর্যালোচনা করতে হবে। এই উন্নয়নই উন্নয়ন। বিশেষ করে শিক্ষা খাতের উন্নয়ন আমাদের উন্নয়নের পুজিকে আরও সমৃদ্ধ করেছে। গতানুগতিক শিক্ষা ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন সাধন করে সরকারের এমন কার্যক্রম আমাদেরকে সত্যিকারভাবে আশাবাদি করে তুলেছে।

কাজী আরিফুর রহমান
উপজেলা নির্বাহী অফিসার
বিয়ানীবাজার, সিলেট।
ই-মেইলঃ unobeanibazar@mopa.gov.bd

রিপ্লাই করুন

অনুগ্রহ করে আপনার মন্তব্য লিখুন
অনুগ্রহ করে আপনার নাম লিখুন