নীড়পাতা সকল বিভাগ উপসম্পাদকীয় সহশিক্ষা (Co-Curriculur Activities) কার্যক্রম এবং আগামীর শিশু

সহশিক্ষা (Co-Curriculur Activities) কার্যক্রম এবং আগামীর শিশু

130
0

কাজী আরিফুর রহমান:
শিক্ষার মূল উদ্দেশ্যই হলো একজন মানুষের মধ্যে লুকিয়ে থাকা প্রতিভাকে বিকশিত করা, তার চিন্তাশক্তিকে শাণিত করা এবং তাকে আত্মবিশ্বাসী, ধৈর্যশীল ও দায়িত্ববান মানুষ হিসেবে গড়ে তোলা। অথচ গতানুগতিক পদ্ধতির শিক্ষা ব্যবস্থায় দেখা যেত শিশুর প্রতিভা বিকাশ তো দূরের কথা, অধিকাংশ ক্ষেত্রে প্রতিভার বিকাশ সংকোচিত হয়। আর এতে করে আমাদের শতশত সম্ভাবনার অপমৃত্যু ঘটে। আমাদের অপার সম্ভাবনা এবং যোগ্যতা থাকার পরও আমরা আন্তর্জাতিক মানদন্ডে সব সময়ই পিছিয়ে ছিলাম। তবে বর্তমান সরকার ২০০৯ সালে ক্ষমতা গ্রহণের পর থেকে শিক্ষাক্ষেত্রে যে বিপ্লব সাধন করেছে, তা আমাদের জাতীয় উন্নয়নের ভিতকে আরও মজবুত করে তুলেছে, আমরা আমাদের মেধাকে বিশ্বের দরবারে প্রমাণ করার সুযোগ তৈরী করে দিয়েছে। সরকার ক্ষমতা গ্রহণের ১ বছরের মাথায় যে শিক্ষনীতি প্রণয়ন করে, তাতে ছাত্রছাত্রীদের মুখস্ত বিদ্যার পরিবর্তে বিকশিত চিন্তাশক্তি, কল্পনাশক্তি অনুসন্ধিৎসু মননের অধিকারী হওয়ার গুরুত্বারোপ করা হয়। আর এ জন্য সরকার প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সহশিক্ষা কার্যক্রম চালু এবং তা সফলভাবে পরিচালনার বাস্তব পদক্ষেপ গ্রহণ করে।

সহশিক্ষা কার্যক্রম হলো ছাত্র জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এই কার্যক্রমগুলো স্কুল-কলেজের সাধরন কারিক্যুলামের বাইরের কাজ, যেগুলো ছাত্রছাত্রীদের দ্বারা সম্পন্ন হয়। এই ধরনের কাজগুলোর বেশিরভাগই স্বেচ্ছাপ্রণোদিত হয়েই ছাত্রছাত্রীরা করে থাকে এবং এগুলো বাধ্যতামূলক কাজগুলোর মতো নয়। সহশিক্ষা কার্যক্রমগুলো ছাত্রছাত্রীরা আনন্দের সাথে গ্রহণ করে। তারা এগুলো ব্যবহারিক এবং বৃত্তিমূলক কাজেও ব্যবহার করতে পারে। সেই সাথে এই কাজকর্ম তাদের সামাজিকতাকে বিকশিত করে। যেহেতু সহশিক্ষা কার্যক্রমে অংশ নেয়ায় কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। তাই ছাত্রছাত্রীরা পূর্ণ স্বাধীনতা বজায় রেখে এবং স্বপ্রণোদিত হয়ে তাতে অংশগ্রণ করে। তাদের আগ্রহের এবং প্রথম পছন্দের বিষয়টিই এখানে স্থান পায়। আর এটাই মূল শিক্ষাক্রম এবং সহশিক্ষা কার্যক্রমের মধ্যে পার্থক্য গড়ে দিয়েছে।
অনেক অভিভাবক শুধু প্রতিযোগিতার মানসিকতায় সহশিক্ষা কার্যক্রমকে কম গুরুত্বপূর্ণ মনে করতেন। তারা এগুলোকে সময় অপচয়ের কারণ মনে করতেন। এগুলোকে অপ্রয়োজনীয় এবং এগুলো থেকে অর্জন করার মতো কিছু নেই বলেই তাদের ধারণা ছিল। বর্তমান সরকার ছাত্রছাত্রী এবং অভিভাবকদের মধ্যে সহশিক্ষা কার্যক্রমের গুরুত্ব তুলে ধরতে এবং এর কার্যকারিতা প্রমাণ করতে সক্ষম হয়েছে।

আমাদের বিদ্যালয়গুলো আজ ছাত্রছাত্রীদের কাছে স্বপ্নের মতো। আর তা বাস্তবায়নে সহশিক্ষার অবদান অনস্বীকার্য। আমাদের বিদ্যালয়গুলোতে নানা ধরণের সহশিক্ষা কার্যক্রম পরিচালিত হয়ে আসছে। এগুলোর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে উৎসব আয়োজন, খেলাধুলা, গানবাজনা, বিতর্ক প্রতিযোগিতা, মডেল, আর্ট, মিউজিক, নাটক, বিতর্ক এবং আলোচনা, গল্প প্রতিযোগিতা, প্রবন্ধ প্রতিযোগিতা, আবৃত্তি প্রতিযোগিতা, ওয়াল ম্যাগাজিন তৈরী, স্কুল ম্যাগাজিন প্রকাশ, লোকগান, লোকনৃত্য, ফুল প্রদর্শনী, স্কুল সাজানো, ভাস্কর্য তৈরী, অ্যালবাম তৈরী, ফটোগ্রাফি, মাটির জিনিস তৈরী, খেলনা তৈরী, সাবান তৈরী, ঝুড়ি তৈরী, প্রতিষ্ঠানের প্রদর্শনী ইত্যাদি। এই কাজগুলো পরিচালনায় বিদ্যালয়ের পাশাপাশি সরকারি প্রশাসন ওতোপ্রতোভাবে জড়িত।

সহশিক্ষা কার্যক্রম কাজে দক্ষতা বাড়াতে এবং সেই সাথে শিখন-শিখানো কার্যক্রমেও বেশ প্রভাব ফেলতে পারে। সহশিক্ষা কার্যক্রম চালুর মাধ্যমে আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন সাধিত হয়েছে। আমাদের শিশুরা শিক্ষার অন্য এক মানে খুজে পেয়েছে। বিদ্যালয়ে যাওয়া আসা আর মুখস্ত বিদ্যার মাধ্যমে আমরা আমদের মেধাকে আস্তাকুড়ে ঠেলে দিচ্ছিলাম। সহশিক্ষা কার্যক্রমে অংশ নিয়ে ছাত্রছাত্রীরা একদিকে যেমন তাদের মেধাকে শানিত করছে অন্যদিকে তাদের অর্জিত জ্ঞানকে প্রয়োগ করার সুযোগ পাচ্ছে। ধরা যাক একটি বিদ্যালয়ে বিজয় দিবস উদযাপন করা হবে। আর সেই অনুষ্ঠান আয়োজনের দায়িত্ব পড়ল ছাত্রছাত্রীদের কাধে। এই এক অনুষ্ঠান আয়োজন করতে গিয়ে যে সকল প্রস্তুতি নিতে হয় তার মধ্যে রয়েছে, অনুষ্ঠানসূচি তৈরী, দায়িত্ব বন্টন, জায়গা নির্ধারণ, অতিথি নির্ধারণ, অতিথি নিমন্ত্রণ, অর্থের সংস্থান, শিক্ষকদের সাথে এবং বড়দের সাথে সমন্বয় সাধন, সৃষ্ট জটিলতা নিরসন, পারস্পরিক বোঝাপড়া, ঐকবদ্ধ কাজের বাস্তব অভিজ্ঞতা, অনুষ্ঠান পরিচালনার মতো নানা ধরনের অভিজ্ঞতা অর্জনের সুযোগ পায়। এভাবে অন্যান্য বিষয়গুলোতেও তাদের সৃজনশীতা প্রদর্শনের ব্যাপক সুযোগ থাকছে। আর এই সৃজনশীরতা বৃদ্ধি করাইতো আমাদের লেখাপড়া করার মূল উদ্যেশ্য। যেগুলো শুধু বই পড়ে বা পরিক্ষায় অংশগ্রহণের মাধ্যমে কখনই সম্ভব নয়। আমরা যদি শুধু পরীক্ষা পাশ বা চাকুরি লাভের আশায় লেখাপড়া করি বা আমাদের শিক্ষাব্যাবস্থা পরিচালিত হয় তাহলে শিক্ষা নামের যে মেরুদন্ড তা কখনই সুগঠিত হতে পারবে না।

সারা দেশের ন্যায় আমাদের বিয়ানীবাজার উপজেলার প্রতিটি বিদ্যালয়ে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে সহশিক্ষা কার্যক্রম পরিচালিত হয়ে আসছে। এক্ষেত্রে ছাত্রছাত্রীদের অংশগ্রহণও চোখে পড়ার মতো। বিদ্যালয়গুলোতে ছাত্রছাত্রীদের প্রাণচাঞ্চল্যতাই প্রমাণ করে আমরা আজ কতটা এগিয়ে যাচ্ছি। সরকার এখানকার বিদ্যালয়গুলোতে সহশিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনায় প্রয়োজনীয় সহযোগিতা অব্যাহত রাখছে। এখানে ছাত্রছাত্রীদের ঝড়ে পড়ার হার ২% এরও নিচে। আর বেশি দিন বাকি নেই যেদিন এ উপজেলায় ঝরে পড়ার হার শূন্যে নেমে আসবে। সারা দেশের সাথে তাল মিলিয় আমরাও আমাদের ভবিষ্যৎ জাতি গড়ার কারিগরদের নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছি।

জাতির ভবিষ্যৎ নির্ধারণের জন্য শিক্ষা নামক মেরুদন্ডকে শক্তিশালী করার ব্রত নিয়ে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলদেশ সরকারের প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছে। জাতিসংঘ আজ আমাদের উন্নয়নশীল দেশের যোগ্যতা অর্জনের স্বিকৃতি দিয়েছে। শুধু উন্নয়নশীল কেন আমরা একটি উন্নত জাতি হিসেবে বিশ্ব দরবারে মাথা উঁচু করে দাড়াতে পারব। যে স্বপ্ন দেখতেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। কাজেই আমাদের উচিত প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে সহশিক্ষা কার্যক্রম বাস্তবায়নের পদক্ষেপ নেওয়া এবং এর মাধ্যমে প্রাথমিক শিক্ষার ক্ষেত্রে বাংলাদেশকে বহিঃবিশ্বে রোল মডেল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা।

 

কাজী আরিফুর রহমান
উপজেলা নির্বাহী অফিসার
বিয়ানীবাজার, সিলেট।
ই-মেইলঃ unobeanibazar@mopa.gov.bd

রিপ্লাই করুন

অনুগ্রহ করে আপনার মন্তব্য লিখুন
অনুগ্রহ করে আপনার নাম লিখুন