নীড়পাতা খেলাধুলা ক্রিকেট সিলেট এবং ক্রিকেট

সিলেট এবং ক্রিকেট

5
0

স্পোর্টস ডেস্ক:

সাতকরার নাম শুনেছেন! খেয়েছেন কখনো? শুরুতে একটু তেতো ধরনের কিন্তু স্বাদটা নিতে পারলে প্রায় অমৃত।

সিলেটের সঙ্গে বাকি বাংলাদেশের সম্পর্কেও সাতকরা স্বাদের মতো একটা ব্যাপার আছে। দূর থেকে একটু আলাদা এবং অন্য রকম কিন্তু মিশে গেলে দেখবেন বাংলাদেশকে ধারণ করায় সিলেট অনেক দিক থেকেই অনন্য। ইতিহাস আর সংস্কৃতিতে পার্থক্যের কিছু কাটাছেঁড়া দাগ থাকলেও শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশের উত্থানে, অগ্রগতিতে সিলেটের অনবদ্য অবদান।

সিলেট আর বাংলাদেশের সম্পর্ক যেমন, খেয়াল করে দেখছি সিলেট আর ক্রিকেটের সম্পর্কও যেন তেমন। অম্লতা আর মাধুর্যের অপূর্ব মিশেল। স্মৃতিতে তিক্ততা আছে, আছে বঞ্চনার বেদনাও। ঢাকা-চট্টগ্রামের পরই তো টেস্ট ভেন্যুর অধিকার নিয়ে সিলেট ছিল হিসাবে। কিন্তু হিসাবটা মেলে না। অপেক্ষা বাড়ে। কিন ব্রিজ প্রায় পরিত্যক্ত হয়ে যায়। সুরমাপারের আলী আমজাদের ঘড়িতে সময় গড়ায় হাহাকার নিয়ে। কিবরিয়া-সাইফুর রহমান হয়ে অর্থমন্ত্রিত্বের ব্যাটন যায় মুহিতের কাছে। এভাবেই ১৮ বছর। কিন্তু আবার এত বছর অপেক্ষা চলল বলেই না মাঝখানে তৈরি হয়ে গেল বাংলাদেশের সুন্দরতম স্টেডিয়ামটি। অষ্টম টেস্ট ভেন্যু কিন্তু সৌন্দর্যে তো এক নম্বর। আজ সকালে যখন টসের মুদ্রা আকাশে উড়বে তখন সিলেটের হাহাকার তাই হাওয়া হয়ে মিলিয়ে যাবে। থাকবে বরং অপেক্ষার মিষ্টি ফল। রূপসী স্টেডিয়ামের রূপের গৌরব।

সাতকরা একান্তই সিলেটিদের কাছে পরিচয়ের প্রতীক, কিন্তু তার জাতীয় পরিচয়ে আগে থাকবে আরো অনেক কিছু। সবার আগে অবশ্যই চা। এবং সেই চা-ও ক্রিকেটের সঙ্গে সম্পর্কের একটা সেতু।

একটা ইতিহাস বলছে, পুরো উপমহাদেশেই প্রথম ক্রিকেট ম্যাচটি হয়েছে সিলেটে। চা বাগান তৈরি করতে ব্রিটিশরা এসেছিল এখানে। অবসরে যে ম্যাচটি খেলে সেটাই পুরো ভারতীয় অঞ্চলের প্রথম ক্রিকেট ম্যাচ। ক্রিকেট ইতিহাস নিয়ে খুব বেশি চর্চা বাংলাদেশে নেই, নেই বলেই আমরা জানি না সেখানে আমির খানের ‘লাগান’ ম্যাচের মতো কোনো ঘটনা ঘটেছিল কি না। কিন্তু ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকেই জানি, জেসপীয় রূপকথা আছে সিলেটে।

ইংল্যান্ডের দেড় শ বছর আগের কোনো সন্ধ্যা। বিয়ারের অর্ডার দিয়ে বারে বসে আছে কোনো এক গ্রাহক। হঠাৎ প্রচণ্ড শব্দে ভেঙে গেল রেস্তোরাঁর কাচ। সন্ত্রস্ত মানুষটিকে বেয়ারা আশ্বস্ত করে বলে, ‘ও কিছু না। জেসপ ব্যাট করতে এসেছে।’ মাঠ থেকে অনেক দূরে রেস্তোরাঁ, গেইলীয় ছক্কাতেও বল ওখানে আসার কথা না, কিন্তু বীরে আবিষ্ট মানুষ যুক্তি খোঁজে না। তার কাজ অন্ধ বিশ্বাস। ১৮ টেস্টে ২১-এর সামান্য বেশি গড় নিয়ে জেসপই এমন একটা মিথ। এমন একটা মিথ আছে ফুটবলেও। ডিয়েগো ম্যারাডোনা যখন নিওয়েলস ওল্ড বয়েজে যোগ দিচ্ছেন তখন ভাষ্যকার ঘোষণা করলেন, ‘সর্বকালের সেরা ফুটবলার এখন থেকে আমাদের দলে খেলবেন।’

ম্যারাডোনা মাইক হাতে নিয়ে বললেন, ‘সর্বকালের সেরা ফুটবলার এরই মধ্যে তোমাদের দলে খেলেছে। তার নাম কার্লোভিচ।’

কেউ কিন্তু চমকায় না। কারণ, রোজারিও শহরের মিথে কার্লোভিচই সর্বকালের সেরা ফুটবলার। কোনোদিনই আর্জেন্টিনা দলে খেলেননি, এমনকি আর্জেন্টিনার বড় দলেও না। কিন্তু স্থানীয় ফুটবলে যাকে ইচ্ছা কাটাতেন, যত ইচ্ছা গোল করতেন। আর তাই তিনিই সর্বকালের সেরা। ও হ্যাঁ, ১৯৭৪ সালের আর্জেন্টিনা বিশ্বকাপ দলের বিপক্ষে একটি প্রস্তুতি ম্যাচে রোজারিও একাদশের হয়ে শুরুতেই দুই গোল করে ফেলেন। এবং দলের বিশ্বকাপগামী ডিফেন্ডারদের নিয়ে নাকি এমন ছেলেখেলা শুরু করেন যে আর্জেন্টিনার কোচ ওদের লজ্জা থেকে বাঁচাতে কার্লোভিচের কোচকে অনুরোধ করেন ওকে উঠিয়ে নিতে। উঠিয়ে নেওয়া হয়। এরও সত্যতা নিয়ে সন্দেহ আছে। তাই যদি হবে তাহলে তো এরপর তাঁর আর্জেন্টিনা দলে আসার কথা, কিন্তু সেরকম কিছু তো হয়নি। তবু তিনি একটা পর্যায়ের মানুষের কাছে ম্যারাডোনার চেয়েও বড়। আর এভাবেই ইতিহাস, সামগ্রিকতা যে বিচারই করুক স্থানীয় প্রত্যক্ষদর্শীদের কাছে জেসপ-কার্লোভিচরাই রয়ে যান অমর কীর্তির শেষ কথা হয়ে। এই সিলেটের আহমেদ নামে এক তরুণ ছিলেন আশির দশকে। ঢাকায় যাননি, বড় পর্যায়ে খেলেননি কখনো, কিন্তু সিলেটের যেকোনো আঞ্চলিক ম্যাচে কোনো একটি দলে থাকত তাঁর অনিবার্য উপস্থিতি। এবং বিশ্বাস করা হতো তিনি যেই দলে সেই দল ম্যাচ জিতবে। বলের গতির প্রতি ভীতিটা এমন ছিল যে উইকেটরক্ষক দাঁড়াত একেবারে বাউন্ডারি লাইনের কাছে। শুনেছি এক-দুইবার কেউ কেউ খেপ দেখে তাঁকে ঢাকায় নিয়ে গিয়েছিলেন, কিন্তু সেখানে কষ্ট করতে হবে, নিয়মিত অনুশীলন এসব দেখে তাঁর ইচ্ছা হয়নি। চেয়েছেন স্থানীয় হিরো হয়েই থাকতে। এই যে সিলেটের এবং সিলেটিদের একটু সরে থাকা, একটু দূরে থাকা সেটা আর দশটা ক্ষেত্রের মতো ক্রিকেটেও বঞ্চিত করে রেখেছে। নইলে, সিলেটে সেই আশির দশকে যে জমজমাট ক্রিকেট হতো তাতে সর্বোচ্চ পর্যায়ে আরো অনেক বেশি সিলেটির উপস্থিতি ছিল অবধারিত। শেষে সেই বৃত্ত ভাঙলেন খুব সম্ভব পারভেজ। ঢাকায় থেকে মোহামেডানের হয়ে ওপেনিং করে দেখালেন সিলেট থেকে গিয়েও ঢাকা জয় করা যায়। এরপর রাজিন, অলক, তাপস, এনামুল জুনিয়র হয়ে এখনকার রাহি-খালেদরা। পুরনোদের সম্মান জানানোতেও সিলেট এগিয়ে থাকছে অন্যদের চেয়ে। স্টেডিয়ামে ঢোকার মুখে ডিসপ্লে বোর্ডে রাজিনদের ছবি জ্বলজ্বল করছে। বিকেলে স্টেডিয়ামের বাইরে পরিচিতদের সঙ্গে আড্ডা মারছিলেন সিলেটের অভিবাসী ক্রিকেটার গোলাম ফারুক সুরু। এর আগে ঢোকার মুখে দেখেছি হাসিবুল হোসেনকে। সবাইকে ডেকেছে সিলেট। কাউকে ভোলেনি।

কাল একেবারে কাকডাকা ভোরে নেমেছি সিলেট এয়ারপোর্টে। অভ্যন্তরীণ ফ্লাইট, তাই ইমিগ্রেশনের ব্যাপার নেই। কিন্তু আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর বলে ‘ইমিগ্রেশন’ সাইন দেওয়া একটা গেট আছে। দেখতে দেখতে সঙ্গী সাংবাদিক সাইদুজ্জামান রসিকতা করে বললেন, ‘বেঙ্গলিদের জন্য কি সিলেটে ঢুকতে ইমিগ্রেশন লাগে নাকি?’ রসিকতা বটে কিন্তু এর ভেতরেও অনেক কথা আছে। সিলেটের কথ্য ভাষায় বাংলাদেশের বাকি অঞ্চলের মানুষ ‘বেঙ্গলি’। তার মানে কি সিলেটিরা ‘বেঙ্গলি’ নন? ইতিহাসে ভাগ-বিভক্তির কিছু দেয়াল আছে। সিলেট বাংলার সঙ্গে যুক্ত-বিযুক্ত হয়েছে বহুবার, শেষে ১৯৪৭-এ গণভোটে গিয়ে পাকাপাকিভাবে হয় বাংলাদেশের অংশ। এর আগে আসামের সঙ্গে সংযুক্তি ছিল বহুদিনের এবং সিলেটি ভাষার সঙ্গে বাংলার যে মিল এর চেয়ে বেশি মিল অহমিয়ার সঙ্গে। আর তাই ভাষাটা অহমিয়া উদ্ভূত বলেই অনেক গবেষক মনে করেন, সিলেটি নাগরি বলে সেই ভাষা লেখার যে বর্ণমালা সেটা দেব নাগরির (যা দিয়ে হিন্দি-নেপালি-ভোজপুরি লেখা হয়) সঙ্গে অনেক মিল। ভাষাগত স্বাতন্ত্র্যের সঙ্গে ভৌগোলিক ব্যাপারও আছে। কাছে বলে ঢাকার চেয়ে অনেক বেশি যোগাযোগ শিলং-শিলচর-গুয়াহাটির সঙ্গে। সুবাদে একটা সাংস্কৃতিক ফারাক বাংলার সঙ্গে। আবার, ওদিকে লন্ডনের লাইন পেয়ে যাওয়াতে অর্থনৈতিকভাবেও শক্তিশালী। তাই কিছুটা গর্ব থাকবে স্বাভাবিক। গর্ব আর অহংকারের মাঝখানের ভেদরেখাটা খুব পাতলা। সেই রেখাটা কিছুটা লঙ্ঘন করেছিলেন সিলেটের শুরুর দিকের সংগঠকরা। অহংকারে ওরা অন্ধ হলেন। তাই কূটচালটা দেখলেন না। যে কূটচালে তখনকার বোর্ড সভাপতির শহর টেস্ট ভেন্যু হয়ে গেল। সরকারি ক্ষমতার শীর্ষে থাকারা বগুড়ায় টেস্ট নিয়ে গিয়ে সিলেটকে আরেক দফা বঞ্চিত করলেন। অথচ এই সরকারের শীর্ষে থাকারা কিন্তু তাদের নির্বাচনী প্রচারণা নিজের শহর থেকে শুরু করেন না। আসেন সিলেটে। এই সেদিনও ঐক্যফ্রন্ট নেতারা সিলেট ঘুরে গেলেন। কেন এখানে আসতে হয় জানেন! এটা কোনো মিথ নয়, নিরেট সত্য, সিলেট শহরের আসনে যারা জিতে তারাই গঠন করে দেশের সরকার। হজরত শাহজালালের মাজার যে এখানে। আর এটাও ইতিহাস যে সিলেটকে বাংলার সঙ্গে প্রথম সংযুক্ত করেছিলেন এই পবিত্র মানুষটিই। কুখ্যাত রাজা গৌরগোবিন্দর আমলে সিলেট ছিল আলাদা রাজ্য, তার একটা সাম্প্রদায়িক অপকর্মেই তখনকার বাংলার মুসলিম শাসক সিলেটকে বাংলার অধিভুক্ত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। তিনি দুইবার ব্যর্থ হন। শেষ সাহায্যে এগিয়ে আসেন হজরত শাহজালাল, তাঁর ৩৬০ জন আউলিয়াকে সঙ্গী করে। তাঁর সহযোগিতাতেই হয় সিলেট জয়। সিলেট বাংলার অংশ। আর হজরত শাহজালালের সূত্রে বাংলার সঙ্গে সিলেটের যে সংযোগ এর ভিত তো আধ্যাত্মিক। মহিমাময় এবং উদারতাভরপুর। বঞ্চিত হলেও পাল্টা লড়াইয়ে না গিয়ে অপেক্ষার শিক্ষাই তো সিলেটের বৈশিষ্ট্য হবে। আর তাই আজকের তৃপ্তিতে পুরনো খেদ নেই। কিছু গোপন দুঃখ যদি থেকেও থাকে তবে উড়ে যাচ্ছে আয়োজনী আনন্দে।

ও হ্যাঁ, কেউ কেউ বলবেন শহরে যে টেস্ট উৎসবের বিশেষ প্রকাশ নেই। তোরণ-ফেস্টুন, উত্সুক টিকিট প্রত্যাশী; এসব কোথায়! সত্যি বললে, বিকেলে স্টেডিয়াম থেকে ফেরার পথে রিকাবীবাজার এলাকায় মাইকিং বাদ দিলে বহির্দৃশ্যের কোনো উত্তেজনার প্রকাশ চোখে পড়েনি। কিন্তু সেটা তো টি-টোয়েন্টির হাওয়ায় টেস্টের প্রতি প্রজন্মের বিরাগের ছবি আসলে। এবং সেটা সিলেটের একার সমস্যা নয়। ক্রিকেটের সমস্যা। সবার সমস্যা। আর নিয়াজ মোহাম্মদ চৌধুরীর গানের চেয়ে আব্দুর রহিমের কনসার্ট নিয়ে প্রকাশ্যে উত্তেজনা বেশি দেখা যাবে, এ তো নতুন কথা নয়। তবু স্থানীয় সাংবাদিক নিশ্চিত করছেন আজ গ্যালারি ঠিকই ভরে যাবে। ভরা উচিত। আজ যে মাঠে স্রেফ বাংলাদেশ-জিম্বাবুয়ে টেস্ট ম্যাচ নয়, একটা অনন্ত আনন্দসম্ভার।

আর সেই আনন্দসম্ভারে সিলেটের ইতিহাস-ঐতিহ্য-বৈশিষ্ট্য-বৈচিত্র্য কী একাকার হয়ে মিশে। সাতকরার অম্ল মাধুর্য, চায়ের জাদুকরী আকর্ষণ, শাহজালালের ঔদার্যের শিক্ষা সবই তো সরবে থাকছে আজকের মঞ্চে।

সম্পূর্ণতার এই সমাবেশে সাদর আমন্ত্রণ।

সূত্র: কালের কন্ঠ

রিপ্লাই করুন

অনুগ্রহ করে আপনার মন্তব্য লিখুন
অনুগ্রহ করে আপনার নাম লিখুন