নীড়পাতা সমকালীন সংবাদ অর্থনীতি নারীর উন্নয়ন ও ক্ষমতায়ন

নারীর উন্নয়ন ও ক্ষমতায়ন

36
0

দেশীয় ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নারীর উন্নয়ন ও ক্ষমতায়ন এখন একটি অন্যতম আলোচিত বিষয়। বিশ্বব্যাপী নারীরা যুগ যুগ ধরে শিক্ষা-দীক্ষায় পিছিয়ে আছে। পরিবার ও সমাজে তাদের স্থান এখনো পুরুষের সমকক্ষ নয়। পুরুষশাসিত সমাজ মনে করে পারিবারিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক ইস্যুতে নারীর মতামতের খুব প্রয়োজন নেই। ফলে নারী তার ন্যায্য অধিকার এখনো পায়নি। সামাজিক অবহেলার কারণে নারীর রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অধিকারও কাক্সিক্ষত পর্যায়ে প্রতিষ্ঠিত হয়নি। পঞ্চাশের দশকের আগে অনেক উন্নত দেশেই নারীর ভোটাধিকার ছিল না। অনেক দেশে জাতীয় নির্বাচনে ভোট দেয়ার সুযোগ থাকলেও প্রার্থী হিসেবে নারীর প্রতিদ্ব›িদ্বতা করার অনুমতি ছিল না। তাই নারীর রাজনৈতিক অধিকার প্রতিষ্ঠায় বিশ্ব নেতারা এগিয়ে আসেন। সত্তরের দশক থেকে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো ছাড়া প্রায় সব দেশেই নারী ভোটাধিকার পায়। সৌদি আরবের নারীদের ২০১৫ সালে ভোটাধিকার প্রতিষ্ঠিত হয় এবং ২০১৫ সালের ১২ ডিসেম্বরে পৌর নির্বাচনে তারা ভোটাধিকার প্রয়োগ করেন।

নারীর প্রতি সব প্রকার বৈষম্য দূরীকরণে ১৯৭৯ সালে জাতিসংঘে সিডও সনদ অনুমোদিত হয়। ১৯৮১ সাল থেকে তা কার্যকর হয়। এ পর্যন্ত বাংলাদেশসহ ১৮০ টিরও বেশি দেশ এতে স্বাক্ষর করেছে। বাংলাদেশ উচ্চ আদালত ২০০৯ সালে সিডও সনদের আলোকে কর্মক্ষেত্র ও শিক্ষাঙ্গনে নারী ও শিশুর প্রতি যৌন হয়রানি বন্ধে একগুচ্ছ দিকনির্দেশনা দিয়েছেন। সেই পরিপ্রেক্ষিতে সরকার পদক্ষেপ নিয়েছে এবং এর সুফল পাওয়া যাচ্ছে।

ইতোমেধ্য নারীর প্রতি সহিংসতা রোধে সরকার ২০১০ সালে পারিবারিক সহিংসতা প্রতিরোধ ও সুরক্ষা আইন প্রণয়ন করেছে। এছাড়া নারী নীতি, মানব পাচার সংক্রান্ত আইন, পর্নোগ্রাফি আইন, শিশু নীতিসহ অনেক আইন প্রণয়ন করা হয়েছে, যা নারী ও শিশুর সুরক্ষায় ভূমিকা রাখছে।

জাতিসংঘ কর্তৃক ২০০০ সালে গৃহীত সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যসমূহের মধ্যে লিঙ্গসমতা, নারীর ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করা, সর্বজনীন শিক্ষা এবং শিশু ও মাতৃস্বাস্থ্য উন্নয়নে বাংলাদেশ অত্যন্ত সাফল্যের সঙ্গে পূরণ করতে সক্ষম হয়েছে। এখন আমাদের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের দিকে এগিয়ে যেতে হবে। জাতিসংঘ পর্যালোচনায় দেখা গেছে, বিশ্ব কর্মঘণ্টার দুই-তৃতীয়াংশ সময় কাজ করে নারী। কিন্তু বৈশ্বিক আয়ের মাত্র ১০ শতাংশ তারা আয় করে।

আবার বিশ্ব সম্পদের এক শতাংশেরও কম সম্পদে নারীর মালিকানা আছে। বিশ্বের প্রাপ্তবয়স্ক অশিক্ষিত মানুষের দুই-তৃতীয়াংশ নারী। আর প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গমনোপযোগী কিন্তু স্কুলে যায় না এমন শিশুর ৬০ শতাংশই মেয়েশিশু। তাই ছোট-বড়, ধনী-গরিব সব দেশই নারীর ক্ষমতায়ন ইস্যুতে সোচ্চার হয়েছে। বিশ্বের প্রভাবশালী দেশ যুক্তরাষ্ট্রে নারীরা এখনো বেতন বৈষম্যের শিকার। হিলারি ক্লিনটন ২০১৬ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ডেমোক্রেটিক পার্টির নির্বাচনী দৌড়ে অংশ নিচ্ছেন। এর প্রস্তুতি হিসেবে তিনি নারীর ক্ষমতায়নকে লাগসই করার বিষয়ে গুরুত্ব দিয়েছেন।

তৃতীয় বিশ্বের দেশ হলেও বাংলাদেশ আর্থ-সামাজিক অগ্রগতিসহ অনেক ক্ষেত্রেই এখন বিশ্বের কাছে রোল মডেল। নারীর অগ্রযাত্রায় বাংলাদেশ এখন অনেক ধনী দেশকেও ছাড়িয়ে গেছে। নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়নের দিক থেকে বাংলাদেশ এখন বিশ্বের প্রথম দশটি দেশের একটি। সরকার ইউনিয়ন পরিষদ আইন সংশোধন করে প্রতি ইউনিয়নে তিনজন করে নারী সদস্যের কোটা নির্ধারণ করেছে। উপজেলা পরিষদে নারী সদস্য অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করা হয়েছে। পৌরসভা ও সিটি কর্পোরেশনেও কাউন্সিলরের এক-তৃতীয়াংশ পদ নারীর জন্য সংরক্ষণ করা হয়েছে। স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোতে বর্তমানে ১৫ হাজারের বেশি নারী সদস্য আছেন। পাশাপাশি উন্মুক্ত প্রতিযোগিতা করে নারীরা মেয়র, চেয়ারম্যান, মেম্বার, কাউন্সিলর নির্বাচিত হয়েছেন। তারা ইউনিয়ন, পৌরসভা, উপজেলা ও সিটি কর্পোরেশনে জনগণের উন্নয়নে নেতৃত্ব দিচ্ছেন। পুরুষ সদস্যদের পাশাপাশি তারাও বিভিন্ন সামাজিক ইস্যুতে মতামত দিচ্ছেন। তাদের প্রস্তাব গৃহীত হচ্ছে। জাতীয় সংসদে ৫০ জন সংরক্ষিত নারী সংসদ সদস্য রয়েছেন। এছাড়া বেশ কিছু নারী সরাসরি প্রত্যক্ষ নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী, স্পিকার, সংসদে বিরোধীদলীয় নেত্রী, হাইকোর্টের বিচারপতি, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি, সেনাবাহিনী, সরকারের উচ্চ পর্যায়ের আমলাসহ উল্লেখযোগ্য সংখ্যক নারী রয়েছেন। তাদের গতিশীল নেতৃত্ব দেশকে আর্থ-সামাজিকভাবে এগিয়ে নিচ্ছেন। রাষ্ট্রের কল্যাণে আইন প্রণয়ন করছেন।

বর্তমান সরকার নারী ও শিশুর উন্নয়নে ব্যাপক কর্মসূচি বাস্তবায়ন করেছে। অটিস্টিক ও প্রতিবন্ধী শিশুদের বিশেষ সুরক্ষার আওতায় আনা হয়েছে। তাদের শিক্ষা, সেবা-শুশ্রƒষা, চাকরি, সামজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হয়েছে। যাতে তারাও স্বাভাবিক শিশুদের মতো বেড়ে উঠতে পারে। ক্ষুদ্র ও নৃ-গোষ্ঠী শিশুদের উন্নয়নেও সরকার নানা পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। গ্রামে গ্রামে কমিউনিটি ক্লিনিক ও স্বাস্থ্যকেন্দ্র হয়েছে। সেখান থেকে দরিদ্র জনগোষ্ঠী স্বাস্থ্যসেবা পাচ্ছে। নারী ও শিশু মৃত্যুহার হ্রাসে বাংলাদেশ সাফল্য অর্জন করেছে। নারী ও শিশু মৃত্যুহার হ্রাসের জন্য বাংলাদেশ জাতিসংঘের সাউথ সাউথ পুরস্কার লাভ করেছে। সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রতি গ্রামে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে যাওয়ার জন্য এখন আর পাঁচ কিলোমিটার দূরে যেতে হয় না। শিক্ষার্থীরা বিনামূল্যে পাঠ্যবই পাচ্ছে। দরিদ্র পরিবারের ছাত্রছাত্রীরা উপবৃত্তি পাচ্ছে। মেয়েরা উচ্চ মাধ্যমিক পর্যন্ত বিনাবেতনে পড়তে পারছে। ডিগ্রিতে পড়ার ক্ষেত্রে সহায়তা কর্মসূচি চালু করা হয়েছে। শিক্ষার ক্ষেত্রে লিঙ্গসমতা নিশ্চিত হয়েছে। মাধ্যমিক পর্যন্ত ছেলের তুলনায় মেয়ে শিক্ষার্থীর সংখ্যাই বেশি। এভাবেই নারীর ক্ষমতায়নের ভিত্তি গড়ে তোলা হচ্ছে।

ক্ষুধা ও দারিদ্র্য নির্মূলেও সরকার নিরলস প্রয়াস চালিয়ে যাচ্ছে। সরকারের দূরদর্শী পদক্ষেপ কুসংস্কারমুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠায় নারীদের সাহস জোগাচ্ছে। কুসংস্কারকে কাজে লাগিয়ে নারীকে অধিকার বঞ্চিত করার সুযোগ সঙ্কুচিত হয়ে আসছে। শিক্ষায় এগিয়ে যাওয়ার কারণে সরকারি ও বেসরকারি চাকরিতে নারীর পদচারণা দ্রুতহারে বাড়ছে। সব পেশায়ই এখন নারীরা কাজ করছে। নারী পুলিশ সদস্যরা জাতিসংঘ শান্তি মিশনে কাজ করছে। সশস্ত্র বাহিনীতে নারীর সাহসী উপস্থিতি সবার দৃষ্টি কাড়ছে। বাঙালি নারীরা শিল্প প্রতিষ্ঠায়ও ভালো করছে। সরকার নারী উদ্যোক্তাদের বিনা জামানতে ও স্বল্প সুদে ঋণ দিচ্ছে। সরকার যুব প্রশিক্ষণ কেন্দ্রগুলোর মাধ্যমে যুব নারী-পুরুষকে বিভিন্ন প্রশিক্ষণ দিচ্ছে। প্রশিক্ষণ শেষে তাদের ঋণ দিচ্ছে। আত্মকর্মসংস্থানের সুযোগ হচ্ছে। বছরে বিপুল সংখ্যক নারী চাকরি নিয়ে বিদেশে যাচ্ছে।

বিভিন্ন দেশের সঙ্গে সরকারের চুক্তির ফলে নারী কর্মীদের বিদেশে যাওয়ার পথ আরো প্রশস্ত হয়েছে। এখন প্রতিটি নারী কর্মীকে তার কর্মের জন্য প্রশিক্ষণের পাশাপাশি গন্তব্য দেশের ভাষা, সংস্কৃতি, শিষ্টাচার, আইনকানুন, প্রথা ইত্যাদি বিষয়ে দুই মাসের প্রশিক্ষণ দেয়া হয়। সরকার দ্বিপাক্ষিক আলোচনার মাধ্যমে বেতন, ছুটি, বীমাসহ চাকরিজীবী হিসেবে সব সুযোগ-সুবিধা আগেই চূড়ান্ত করে। গত চার বছরে ১ লাখ ২০ হাজার নারীকর্মী সুনির্দিষ্ট চাকরি নিয়ে বিদেশে গেছে এবং এ বছর ৪০ হাজার নারীকর্মী সৌদিতে প্রেরণ করার প্রক্রিয়া চলছে। এতে গ্রামীণ নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন হচ্ছে। যার প্রভাব সমাজ ও রাজনীতিতে পড়ছে। সন্তানদের উন্নত ভবিষ্যৎ নিশ্চিত হচ্ছে। দারিদ্র্য দূরীভূত হচ্ছে। নারীর ক্ষমতায়নে বাংলাদেশ এখন উন্নয়নশীল বিশ্বের জন্য অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত। এ অগ্রযাত্রাকে টেকসই করতে সরকারি নীতির ধারাবাহিকতা রক্ষা করতে হবে। এজন্য জনগণকে আরো তৎপর হতে হবে। সমাজকে অন্ধত্ব থেকে আলোর পথে আনতে সরকারকে সহযোগিতা করতে হবে।

49

রিপ্লাই করুন

অনুগ্রহ করে আপনার মন্তব্য লিখুন
অনুগ্রহ করে আপনার নাম লিখুন